মন্ত্রিসভায় থাকা না থাকা এবং বিরোধী দলীয় উপনেতা নির্বাচন প্রশ্নে বিভক্তি দেখা দিয়েছে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে (জাপা)। এই বিভাজন দলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে। দলের ৪০ এমপির একাংশ এই দুই ইস্যুতে জাপার সংসদীয় দলের প্রধান ও বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। একাংশ রয়েছেন দলের চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের সঙ্গে। আরেক অংশ এরশাদ ও রওশন-দু’জনের নেতৃত্বের প্রতিই ক্ষুব্ধ। শেষের অংশটি অবশ্য শুধু সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকা না থাকার প্রশ্নে এই অবস্থানে।
রওশন এরশাদ দলের ৩০ জন এমপিকে নিয়ে সোমবার সংসদ ভবনে বৈঠক করেন। বিকাল সাড়ে তিনটা থেকে তার সভাপতিত্বে এই বৈঠক চলে প্রায় দেড়ঘণ্টা পর্যন্ত। এটি জাপার পার্লামেন্টারি পার্টির আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছিল জানিয়ে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী সোমবারেই ইত্তেফাককে বলেছেন, বৈঠকে উপস্থিত এমপিদের সর্বসম্মতিক্রমে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদকে বিরোধী দলীয় উপনেতা মনোনয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই বিষয়ে উপস্থিত এমপিদের স্বাক্ষর সম্বলিত রেজুলেশনও গ্রহণ করা হয়।
ওই বৈঠকের পর এবং সংসদের অধিবেশন শেষে সোমবার রাতেই জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে একটি চিঠি দেন রওশন এরশাদ। তার স্বাক্ষরিত চিঠিটি স্পিকারের কাছে দেন তাজুল ইসলাম চৌধুরী। চিঠির সঙ্গে ৩০ এমপির স্বাক্ষর সম্বলিত রেজুলেশনটিও দেন রওশন। গতকাল মঙ্গলবার চিঠির একটি কপিতে দেখা যায়, স্পিকারকে লেখা চিঠিতে রওশন লিখেছেন ‘আপনার সদয় অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জানানো যাচ্ছে যে, অদ্য ৮ সেপ্টেম্বর রোজ সোমবার আমার কার্যালয়ে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির পার্লামেন্টারি পার্টির একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় আমার প্রস্তাব মোতাবেক জাতীয় সংসদের ১৭৯, ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদকে সর্বসম্মতিক্রমে বিরোধী দলীয় উপনেতা নির্বাচিত করা হলো।’ স্পিকারকে চিঠি পৌঁছে দেয়ার কথা ইত্তেফাকের কাছে স্বীকার করেছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী। তবে সোমবারের এই বৈঠককে পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক বলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এরশাদের সঙ্গে থাকা একাধিক সংসদ সদস্য। তাদের দাবি, এটি কোনো পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক ছিল না। কারণ বৈঠকের বিষয়ে তাদেরকে আগে কোনো নোটিস বা চিঠি পাঠানো হয়নি। কাজেই এই ধরনের কোনো সভায় বিরোধী দলীয় উপনেতা নির্বাচনের বিষয়টিকে ‘অনৈতিক’ বলে আখ্যায়িত করছেন তারা।
স্পিকারকে রওশনের দেয়া চিঠির সঙ্গে সংযুক্ত রেজুলেশনে জাপার মোট ৪০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে যে ১০ জনের স্বাক্ষর নেই তারা হলেন- এইচএম এরশাদ (রংপুর-৩), ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ (চট্টগ্রাম-৫), জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু (চট্টগ্রাম-৯), এডভোকেট নূরুল ইসলাম তালুকদার (বগুড়া-৩), এম এ হান্নান (ময়মনসিংহ-৭), ফখরুল ইমাম (ময়মনসিংহ-৮), সেলিম ওসমান (নারায়ণগঞ্জ-৫), পীর ফজলুর রহমান (সুনামগঞ্জ-৪), এডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২) ও বেগম মাহ্জাবীন মোরশেদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪৫)। তবে তাদের মধ্যে কয়েকজন বিদেশে থাকায় সোমবারের বৈঠকে উপস্থিত থাকতে কিংবা রেজুলেশনে স্বাক্ষর করতে পারেননি বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, কাজী ফিরোজ রশীদকে বিরোধী দলীয় উপনেতা নির্বাচনের বিষয়ে রওশনের চিঠির বিষয়ে স্পিকারকে পাল্টা চিঠি দিয়েছেন জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। চিঠিতে এরশাদ লিখেছেন-বিরোধী দলীয় উপনেতা মনোনয়নের বিষয়ে জাপা এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকেও এই ধরনের সিদ্ধান্ত হয়নি। চিঠির সঙ্গে এরশাদ দলের গঠনতন্ত্রের ২২ নম্বর ধারার অংশটিও যুক্ত করেছেন। প্রসঙ্গত, জাপার গঠনতন্ত্রের ২২ নম্বর ধারায় বলা আছে-দলীয় চেয়ারম্যানের অনুমতি সাপেক্ষে পার্লামেন্টারি পার্টি দলের উপনেতা, চিফ হুইপ ও হুইপ নির্বাচিত করবে।
তবে রওশনপন্থী এমপিদের কয়েকজন ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে অভিযোগ করেন, গঠনতন্ত্র নতুন করে ছাপানো হয়েছে। দলের সর্বশেষ কাউন্সিলে অনুমোদিত ধারাসমূহে এই ধরনের কোনো বিষয় ছিল না। কাউন্সিল ছাড়াই নতুন করে বিষয়টি গোপনে গঠনতন্ত্রে যুক্ত করা হয়েছে। বিরোধী দলীয় উপনেতা প্রশ্নে জুলাই মাসেও স্পিকারকে পাল্টাপাল্টি চিঠি দেন রওশন ও এরশাদ।
শুধু স্পিকারকে পাল্টাপাল্টি চিঠি দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি এরশাদ ও রওশন। এরপর দু’জন পৃথকভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও গেছেন। গতকালও সংসদ অধিবেশনের মাগরিবের নামাজের বিরতির সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সংসদ ভবন কার্যালয়ে দেখা করেছেন এরশাদ। দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু তার সঙ্গে ছিলেন।
এদিকে, বিরোধী দলীয় উপনেতা প্রসঙ্গের পাশাপাশি মন্ত্রিসভায় জাপার থাকা না থাকার প্রশ্নে দলের এমপিদের একটি অংশ এরশাদ ও রওশন দু’জনের ওপরই চটেছেন। গত ১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত দলের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে মন্ত্রিসভা থেকে বের হয়ে আসতে দলীয় নেতাদের নির্দেশ দেন এরশাদ। সেদিন তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন রওশনও। ওই বৈঠকেই এরশাদকে উদ্দেশ করে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেছিলেন ‘আপনি নিজেও কিন্তু পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। কাজেই কথাবার্তা বলতে হলে সবকিছু হিসাব করেই বলা উচিত। পদত্যাগ করতে হলে সবারই পদত্যাগ করতে হবে।’ সূত্রমতে, ওইদিনের বৈঠক শেষে মন্ত্রিসভায় থাকা জাপা নেতাদের কেউ কেউ রওশনের সামনেই বলেছেন ‘আপনারা যদি এরকম করেন তাহলে আমরা আপনাদের দু’জনের কারও সাথেই থাকবো না।’
রবিবারও ঢাকার বাইরে দুটি অনুষ্ঠানে এরশাদ বলেছেন ‘মন্ত্রিসভায় থেকে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা যায় না। মন্ত্রিসভা থেকে জাপার বের হয়ে আসার বিষয়ে আলোচনা চলছে, শিগগিরই আমরা বের হয়ে আসবো।’
এরশাদের এই বক্তব্যের পরদিন, সোমবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এমপিদের বৈঠকে এই নিয়ে আবারও ক্ষোভ প্রকাশ করেন মশিউর রহমান রাঙ্গা। কয়েক এমপিও এরশাদের কঠোর সমালোচনা করেন। বৈঠক শেষে মন্ত্রিসভায় থাকা জাপার তিন নেতা ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ (পানিসম্পদ মন্ত্রী), মশিউর রহমান রাঙ্গা (পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী) এবং মুজিবুল হক চুন্নু (শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী) ইত্তেফাকের সঙ্গে পৃথক আলাপকালে বলেছেন, পার্লামেন্টারি পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাপা মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছে। এখন বের হওয়ার বিষয়ে পার্লামেন্টারি পার্টি কিংবা দলের প্রেসিডিয়াম কোনটিরই সিদ্ধান্ত নেই। কাজেই এরশাদ যা বলছেন, তা তার নিজস্ব অনুভূতি।