প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সম্প্রচার মাধ্যমকে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম-নীতির মধ্যে পরিচালনা করে এর মানোন্নয়নের স্বার্থেই ‘জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালা-২০১৪’ প্রণয়ন করেছে সরকার। সমালোচনা কিংবা বিরোধীতা থাকলেও জনগণের অধিকার সুরক্ষা করতেই এই নীতিমালা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন করা হবে। সারাবিশ্বের মতো আমাদেরকেও জাতীয় সমপ্রচার নীতিমালা মেনে চলতে হবে। কারণ কোন প্রতিষ্ঠান নীতিমালা ছাড়া চলতে পারে না। এটাই বাস্তবতা যে আপনি যেভাবে আপনার অধিকার ভোগ করবেন, একইভাবে অন্যের অধিকারও আপনাকে সংরক্ষণ করতে হবে।
বুধবার সকালে রাজধানীর দারুসসালমে জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউটে (নিমকো) নব গঠিত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন (বিএফটিআই)’র প্রথম প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার আলোকে সম্প্রচার কমিশনও গঠন করার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের একটি দাবি ছিলো সম্প্রচার নীতিমালা করার এবং সেই নীতিমালা যখন গ্রহণ করা হলো তখনই এক দল এর বিরুদ্ধে ওঠে পড়ে লেগেছে। তবে যারা এখন বিতর্ক তুলছেন, তাদের জানা উচিত অধিকার পেতে হলে অন্যের অধিকারও সংরক্ষণ করতে হবে। তিনি বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা ওয়েবসাইটে দেওয়া ছিলো প্রায় তিন সপ্তাহেরও বেশী, সকলের মতামত নেয়া হয়েছে। তাছাড়া পৃথিবীর সবদেশেই সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং এর ভিত্তিতে সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার উন্নয়ন ও গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে গণমাধ্যমের প্রসার ও স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। এ লক্ষ্যে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ প্রণয়ন ও তথ্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, সংবাদপত্রকেও শিল্প হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। ৮ম সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ড গঠন এবং এর সুপারিশের আলোকে সাংবাদিকদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার পাশাপাশি সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপণ হারও যৌক্তিকহারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, সরকার ‘সাংবাদিক সহায়তা ভাতা/অনুদান নীতিমালা-২০১২’ প্রণয়ন করে প্রতিবছর সাংবাদিকদের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। তাদের কল্যাণে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ‘বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট আইন-২০১৪’ জাতীয় সংসদে পাস হয়ে ইতিমধ্যে তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে।
নতুন টিভি চ্যানেল’র অনুমোদন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের অনুমোদন দেয়া সব টেলিভিশন চ্যানেল কাজ শুরু করলে দেশে মোট চ্যানেলের সংখ্যা ৪১টি হবে। ভবিষ্যতে আরো অনুমোদন দেয়া হবে। এ সময় তিনি বলেন, আমরাই অনুমতি দিলাম। আর সুযোগ পেলেই এই টেলিভিশন আমাদের বিরুদ্ধে যা খুশি বলে যায়। তিনি বলেন, ২৪টি এফএম কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। আমরা কমিউনিটি রেডিও চালু করে দিয়েছি। এছাড়া ৩২টি কমিউনিটি রেডিও চালু করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সুস্থধারার চলচ্চিত্র বানাতে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলচ্চিত্র এমন ধরনের নির্মাণ করা উচিত্ যেখানে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ফুটে ওঠে। খেয়াল রাখতে হবে যাতে যুব সমাজকে বিপথগামী না করে। একই সঙ্গে পল্লীর মানুষের চাহিদার প্রতি যত্নশীল হতে হবে। চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এফডিসিকে আমরা ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছি। চলচ্চিত্রের উন্নয়নে এফডিসির বিদ্যমান যন্ত্রপাতির সংস্কার, উন্নয়ন ও সমপ্রসারণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য কারিগরি সুবিধা এবং ডিজিটাল প্রদর্শন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়ার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ক্যামেরাসহ নতুন যন্ত্রপাতি চলে আসবে। সিনেমাকে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসাবে উল্লেখ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রেক্ষাগৃহগুলোর আধুনিকায়নে গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকার বাইরে সিনেপ্লেক্স নির্মাণের ক্ষেত্রে আরো বেশি কর অব্যাহতি দেয়া হবে। এছাড়া সিনেমা হলগুলো আধুনিকায়ন করা হবে। চলচ্চিত্র শিল্প বিকাশের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি টেলিভিশন ও দেশের সব প্রচার মাধ্যমের দ্রুত বিকাশের লক্ষ্যে সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প যেন বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে পারে; সে মান রক্ষার লক্ষ্যেই চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হয়েছে।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) কার্যক্রম শুরুর ঘটনাকে ‘একটি মাইলফলক’ হিসাবে আখ্যায়িক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে এ দুটি গণমাধ্যমের তাত্পর্যপূর্ণ অবদান রয়েছে। এই মাধ্যমগুলো সমাজ সংস্কার করে। কূপমুণ্ডকতা থেকে বের হতে সহায়তা করে। কোনো ভুল হলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তিনি বলেন, আমরা রাজনীতিবিদ। আমরা বক্তৃতা দেই। কিন্তু যে কোনো বক্তব্য চলচিত্র ও টেলিভিশনের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। তাই যুগ যুগ ধরে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন মাধ্যম শিক্ষাবিস্তার, জাতিগঠন ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে আসছে। গণমাধ্যমের উন্নয়নে ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তত্কালীণ প্রাদেশিক আইন পরিষদে ‘পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা বিল’ উত্থাপন, চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এফডিসি) সৃষ্টি, সাংবাদিকতার বিকাশ ও সুষ্ঠু প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে জাতীয় প্রেস ইনস্টিটিউট প্রকল্প অনুমোদনসহ গণমাধ্যমের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
দেশীয় চলচ্চিত্রের প্রশংসা করে শেখ হাসিনা বলেন, কাজের ব্যস্ততায় দেশীয় চলচ্চিত্র দেখার সময় তার সবসময় হয় না। তবে ভ্রমণের সময়ে বিমানে তিনি দেশের ছবিই দেখেন। তিনি বলেন, আমাদের চলচ্চিত্রের এতো সুন্দর মান দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। এ ধারা অব্যহত রাখতে হবে। এ সময় দর্শক গ্যালারী মুহুর্মুহু করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠে। শেখ হাসিনা বলেন, এ দেশের চলচ্চিত্রের মান খুবই উন্নত। এ শিল্পে সুস্থ পরিবেশ সৃষ্টি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হলে বাংলাদেশী চলচ্চিত্র বিশ্বের যে কোন চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। অশ্লীল চলচ্চিত্র বন্ধের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অশ্লীল চলচ্চিত্র, ধুমধারাক্কা, হাঙ্গামা বা ছেলেমেয়েদের বিপথে নিয়ে যায় সে ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। পরিবার নিয়ে দেখা যায় এমন শিক্ষনীয় ও বিনোদনমূলক চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে। অশ্লীল চলচ্চিত্র বন্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার চলচ্চিত্রে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। অশ্লীল চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রদর্শন এবং ভিডিও পাইরেসি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। ডিজিটাল আধুনিক সার্টিফিকেশন প্রথা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। চলচ্চিত্র সংসদ নিবন্ধন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তার সরকার বেসরকারি খাতে টেলিভিশনের বিকাশের সুযোগ করে দেয়ায় এ খাতে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। এই খাতে ধীরে ধীরে শিল্পী-কলাকুশলীর মেধা, মান ও কাজের সুযোগ অনেক বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন তথ্য প্রদানের পাশাপাশি মানুষের চিত্তবিনোদনের খোরাক যোগায়। মনের কথা বলে। পরিবার ও সমাজ জীবনের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, সংগ্রাম আর ন্যায়-অন্যায়ের উপাখ্যান তুলে ধরে। যা শুভবোধকে জাগিয়ে তোলে। বিবেককে শাণিত করে। চেতনার বিকাশ ঘটায় এমনকি ভবিষ্যত্ পরিকল্পনাতেও গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
তথ্য সচিব মর্তুজা আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বিএফটিআই’র প্রধান নির্বাহী ড. মোহাম্মাদ জাহাঙ্গীর হোসেন প্রমুখ।