ভ্যাটের বিদ্যমান হার বহাল রাখার দাবি

নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে ক্ষোভ ব্যবসায়ীদের

 
 
 
 
 
 
নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা হলেও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে বলে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ব্যবসায়ীদের স্বার্থ উপেক্ষা করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে এই আইন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন তারা। একই সঙ্গে প্যাকেজ পদ্ধতির ভ্যাট অব্যাহত রাখাসহ ভ্যাটের বিদ্যমান হার অপরিবর্তিত রাখার দাবি জানান তারা। বুধবার ভ্যাট আইন নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে ব্যবসায়ী নেতারা এ দাবি জানান। নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে আয়োজিত এ সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সেমিনারে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন ভ্যাট আইন আবার পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য শিগগিরই একটি কমিটি গঠন করার ঘোষণা দেন রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলেও জানানো হয়।
২০১২ সালের নভেম্বরে নতুন ভ্যাট আইন সংসদে পাশ হয়। আইনটি আগামী বছরের জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী, সব ধরণের পণ্য ও সেবাকে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়বেন বলে দীর্ঘদিন থেকেই এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন ব্যবসায়ীরা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ভ্যাট আইনের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তা বিবেচনা ছাড়া নতুন ভ্যাট আইন না করার জন্য এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে মতামত দেয়া হয়েছিল। অর্থমন্ত্রীও ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা করে ভ্যাট আইন প্রণয়নের জন্য বলেছিলেন। তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন যে, প্যাকেজ পদ্ধতিতে ভ্যাট প্রদানের পদ্ধতি থাকবে। আলোচনা ঠিকই হলো। কিন্তু আমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হলো না। এটাই দুঃখ। নতুন আইনে ব্যবসায়ী পর্যায়ে প্যাকেজ ভ্যাট অন্তর্ভূক্ত না করায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ খাতে নিবন্ধিত করদাতাকে বিক্রয়ের উপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে যা কোন ব্যবাসায়ীর পক্ষেই প্রতিপালনযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের সংবেদনশীল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নতুন আইনে বিবেচনায় আনলে আজকের এ সভার প্রয়োজন হতো না। বিদ্যমান ভ্যাট আইনের বেশকিছু অসঙ্গতি তুলে ধরে তিনি এসব বিষয়ে ব্যবসায়ীবান্ধব ও যৌক্তিক পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আনিসুল হক নতুন আইনে ব্যবসায়ীদের দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ জানান। তিনি বলেন, জন কেরির (যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী) অনুরোধ ফিরিয়ে দেয়ার সাহস রাখেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু আমাদের বিষয় নিয়ে মন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন হয় না কেন? তিনি বলেন, এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে ২০১২ সারে ৯টি চিঠি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আইনে তার কোন প্রতিফলন ছিল না। আইএমএফকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আইন প্রণয়নের সঙ্গে বারাক ওবামার বংশধররা জড়িত আছেন। আইন পর্যালোচনায় নতুন কমিটি করুন, যেখানে ওবামার বংশধররা থাকতে পারবে না।
ব্যবসায়ীদের দাবির সঙ্গে একমত প্রকাশ করে বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, এই আইনে বড় ব্যবসায়ীরা হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না কিন্তু উঠতি ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়টি খেয়াল রাখার দরকার ছিল। অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি আইনটি পর্যালোচনায় একটি কমিটি করার প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ও রিজার্ভ ভালো অবস্থানে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইএমএফের কাছ থেকে অর্থ নেয়ার প্রয়োজন নেই। আইএমএফকে বাদ দিয়ে দেশের লোকজনকে গুরুত্ব দিয়ে এবারের আইন হলে তা ভালো আইন হতো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী ভ্যাট আইন নিয়ে সমপ্রতি এফবিসিসিআই সভাপতির একটি চিঠির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ওই চিঠি পেয়ে আমি বিস্মিত হয়েছি। একই সঙ্গে দু:খিতও হয়েছি এ জন্য যে, আপনাদের বিষয় প্রাধান্য পায় নি। কিন্তু এত আলোচনার পরও আইনটি সরকার বা আপনাদের জন্য ভালো হলো না। আজকে বিদ্রোহ করে বসলেন। এখন আমরা যাবো কোথায়? তবে নতুন ভ্যাট আইনটি খুবই ভালো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন আইনই বলবত্ থাকবে। ১৯৯১ সালের আইনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এটি এখন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। তবে আইনটি পর্যালোচনায় একটি কমিটি গঠন করা হবে। এনবিআরের একজন সদস্যকে চেয়ারম্যান ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিসহ দুইজনকে কো চেয়ারম্যান করে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিলে এনবিআর চেয়ারম্যান তার বক্তব্যে শিগগিরই নতুন কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেন, নতুন আইনে ব্যবসায়ী বা সরকার কারো ইচ্ছাই পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় নি। আইনটির ইতিবাচক দিক নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা বাড়ানোর জন্য এনবিআরের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এনবিআর সদস্য (মূসক নীতি) ব্যরিস্টার জাহাঙ্গীর হোসেন মূল প্রবন্ধে নতুন ভ্যাট আইনের ইতিবাচক বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নতুন আইনে স্বচ্ছতা বাড়বে। ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমবে।
এনবিআর গোলাম হোসেনের সভাপতিত্বে আলোচনায় অন্যদের মধ্যে অংশ নেন খাদ্য মন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন, বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম, ব্যবসায়ী নেতা আব্দুস সালাম, এস এ কাদের কিরণ প্রমুখ।