বিশেষ প্রতিনিধি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবন্ধীরা যাতে সুস্থ জীবন পায় সেজন্য সব ধরনের সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, আমাদের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, কিন্তু আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। সীমিত সম্পদ নিয়েই প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন নিশ্চিতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। এই বিষয়টিকে অবহেলা করলে হবে না। সকলকে এক সাথে কাজ করতে হবে। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, অটিস্টিকদের সহায়তায় সকল রকমের সহায়তা করবো। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ইতিমধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে প্যান প্যাসিফিক হোটেল সোনারগাঁওয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রীদের ৩২তম সম্মেলনে ‘অটিজমের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ও বহুমাত্রিক কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিজম আক্রান্তরা কোনভাবেই আমাদের বোঝা নয়। অনেক মনীষী আছেন যারা এ সমস্যায় আক্রান্ত। সঠিক পরিচর্যা ও সেবা পেলে তাদের অনেকে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারবে।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসরত অটিস্টিকসহ নানা ধরনের সীমাবদ্ধতায় আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে আমরা জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনকে অধিদপ্তরে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছি।
বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের যথাযথ শিক্ষা গ্রহণের পথে সকল প্রকার বাধা নির্মূলের দিক-নির্দেশনা উল্লেখ করে তার সরকার নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। শিক্ষা কারিকুলামে প্রতিবন্ধী বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকার সকল প্রকার বৈষম্যমুক্ত একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, এক সময় আমাদের দেশে মূলধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করার সুযোগ পেতো না। বর্তমানে সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে এক লাখের অধিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমির কার্যক্রমে প্রতিবন্ধী শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করেছে। অটিস্টিক শিশুদের প্রাথমিক সেবা প্রদানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্টার ফর নিউরো ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অটিজম ইন চিলড্রেন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তার মেয়ে সায়মা হোসেন বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব পেশ করেন। একই বছরের ডিসেম্বরে প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়, যা ছিল বাংলাদেশের জন্য এক বিরল সম্মান।
উল্লেখ্য, সায়মা হোসেন গ্লোবাল অটিজম পাবলিক হেলথ (জিএপিএইচ) বাংলাদেশের ন্যাশনাল অ্যাডভাইজারি কমিটির চেয়ারপার্সন।
শেখ হাসিনা বলেন, সায়মা হোসেনের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ২০১১ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিজঅ্যাবলিটিস ইন বাংলাদেশ অ্যান্ড সাউথ এশিয়া শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সেমিনার।
তিনি বলেন, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন-২০১১ সালে সম্পূর্ণ অবৈতনিক অটিস্টিক বিশেষায়িত স্কুল চালু করে। ডিজঅ্যাবিলিটি ইনফরমেশন স্টোরেজ সফটওয়্যার তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে।
বৈঠকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা প্যানেলের সদস্য সায়মা হোসেন পুতুল সভাপতিত্ব করেন। একই সঙ্গে তিনি অটিজমের উপর গ্লোবাল অটিজম শীর্ষক মূল নিবন্ধ (কি নোট পেপার) উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের ডিন ড. মাইকেল ক্লাগ জনস্বাস্থ্যের প্রেক্ষাপটে অটিজম বিষয়ে নিবন্ধ উপস্থাপন করেন। এছাড়া কুয়েত সেন্টার ফর অটিজমের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক এবং বিশ্ব অটিজম
অর্গানাইজেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. সামিরা আল সাদ এ বিষয়ে মা-বাবা ও সাংগঠনিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিবন্ধ উপস্থাপন করেন। এরপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ড. পুনম ক্ষেত্রাপল সিংয়ের সঞ্চালনায় সাধারণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. হর্ষবর্ধন, ভুটানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী লিওনপো তানদিন ওয়াংচুক, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইতালি, তুরস্ক, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূত ও চীনের চার্জ দ্য এ্যাফেয়ার্স এবং ইউএসএআইডি, ইউএনডিপি, ইউএনএফপিএ, ইউনিসেফ, আইসিআরসি এবং বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় বিশ্বজুড়ে অটিজমের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি ‘সমন্বিত ও বিস্তৃত উদ্যোগ’ নেয়ার একটি প্রস্তাব সায়মা হোসেন পুতুল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈঠকে তুলে ধরেন। ঢাকায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি ও অটিজম বিশেষজ্ঞরা এই বৈশ্বিক উদ্যোগকে সমর্থন জানান।
বৈঠক শেষে হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সায়মা হোসেন পুতুল বলেন, অটিজমের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে যৌথ লড়াই শুরু হয়েছে। আমরা আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে সফল হয়েছি। তবে এটা সবে শুরু, ভবিষ্যতে এটি অনেক দূর এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, অটিস্টিক ব্যক্তি, তাদের পরিবারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে অটিজমের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে কাজ করাই এ উদ্যোগের মূল ধারণা।
অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘অ্যাক্সিলেন্স ইন পাবলিক হেলথ অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী সায়মা হোসেন পুতুল, যিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অটিজম স্পিকস’র পরামর্শক হিসেবেও কাজ করছেন।
এ পুরস্কার অটিস্টিক শিশু, তাদের পরিবার ও যারা অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করেন তাদের উত্সর্গ করে গতকাল প্রেস ব্রিফিংয়ে সায়মা হোসেন পুতুল বলেন, পুরস্কার পাওয়ায় দায়িত্ব আরো বেড়ে গেলো। অটিজম নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সব সময়ই নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিল। এই ভূমিকা আমরা অব্যাহত রাখতে চাই।
বাংলাদেশে অটিস্টিকদের জন্য সরকারের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে পুতুল বলেন, অটিজমের বিষয়টি নিয়ে সাধারণের মধ্যে আলোচনার শুরুর কাজটি আমরা খুব ভালভাবে করতে পেরেছি। মানুষ সচেতন হচ্ছে। মানুষ এখন জানে অটিজম কী? অন্যান্য প্রতিবন্ধীতার সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায়? কিন্তু আমাদের আরো অনেক কিছু করতে হবে।
পুতুল বলেন, আমি মনে করি, এখন আমাদের সমন্বয়মুখী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। প্রত্যেকটি দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প নিতে হবে, যাতে অটিস্টিকদের সেবার খরচ কমিয়ে এনে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা যায়। একই সঙ্গে সরকারি, বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি ‘কার্যকর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলার ওপরও জোর দিয়ে তিনি বলেন, অটিজমের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা আমরা একা পারবো না। এজন্য সবার সাপোর্ট লাগবে। অটিজম ব্যবস্থাপনায় আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অটিস্টিক শিশুদের পরিবারগুলোকে সাপোর্ট দিতে হবে।
এদিকে জুলিয়েন পিটনের নেতৃত্বে অটিজম বিশেষজ্ঞদের দশ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সংসদ ভবনের কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিস্টিক শিশুদের কল্যাণ নিশ্চিতকরণে প্রতিটি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা উচিত। সাক্ষাত্ শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ কে এম শামীম চৌধুরী সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন।
বৈঠকে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা অটিজম নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কর্মতত্পরতা, তার যুক্ত থাকা ও অভিজ্ঞতার প্রশংসা করে বলেন, অন্যান্য দেশেও এর প্রতিফলন হওয়া উচিত।
প্রতিনিধি দলের সদস্যরা আরো বলেন, ভবিষ্যত্ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শেখ হাসিনা অটিস্টিক শিশুদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারবেন বলে তারা মনে করেন। এ প্রসঙ্গে তারা বলেন, অটিজম নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড অন্যান্য দেশেও চমত্কার প্রভাব ফেলবে। তারা ঢাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্মেলনের সময় অটিজম নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতির প্রশংসা করেন। তারা বলেন, এ উপস্থিতির কারণে অনুষ্ঠানটি সাফল্যমণ্ডিত হয়েছে।