বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব ও কর্তৃপক্ষের নানা অনিয়মের খেসারত দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। জানা গেছে, সাত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে স্নাতক ডিগ্রিধারী কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে বার কাউন্সিলের ‘আইনজীবী সনদ পরীক্ষায়’ অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। যদিও এসব শিক্ষার্থী সহকারী জজ হওয়ার পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ইতিপূর্বে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বার কাউন্সিলে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পেলেও সম্প্রতি হঠাত্ করেই তাদের আর নিবন্ধন ফরম দেয়া হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনই নিবন্ধন ফরমের জন্য বার কাউন্সিলে ধরনা দিচ্ছেন। কিন্তু ফরম কবে দেয়া হবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না কেউই।
প্রসঙ্গত, আইন পেশায় যোগ দেয়ার পূর্বে আইনে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের বার কাউন্সিলের ‘এনরোলমেন্ট’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। দেশে মোট ৭৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে আইন বিভাগ। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বা একাধিক ক্যাম্পাসে আইন বিভাগ খোলা হয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগগুলোতে রয়েছে ৩০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। যাদের মধ্যে প্রায় ৭/৮ হাজার শিক্ষার্থীর ওই ‘এনরোলমেন্ট’ পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্বদ্যািলয়ের মূল ক্যাম্পাসের বাইরে শাখা ক্যাম্পাস খোলার আইনি বৈধতা নেই। কিন্তু কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে মূল ক্যাম্পাসের বাইরে মালিকদের একটি অংশ একই নামে শাখা ক্যাম্পাস খুলেছেন। এরকম একটি ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের মিরপুরে অবস্থিত মূল ক্যাম্পাসের বাইরে যেসব শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে তা অবৈধ ঘোষণা করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে। একইসঙ্গে যেসব মালিক শাখা ক্যাম্পাস খুলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছেন তাদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের মিরপুর মূল ক্যাম্পাসটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত হলেও মালিকানা দ্বন্দ্বের কারণে ওই ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরাও বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।
এছাড়া কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে রয়েছে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ। এ ধরনের কয়েকটি অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। কিন্তু যারা নিয়মমাফিক বৈধ ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম সমাপ্ত করেছেন তারাও এখন এই জালিয়াতি বা মালিকানা দ্বন্দ্বের খেসারত দিচ্ছেন। সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অভিযোগে বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ ঢালাওভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল আইন ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের ‘এনরোলমেন্ট’ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিচ্ছে না। যদিও সনদ জালিয়াতির অভিযোগ সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধেই রয়েছে। কিন্তু বার কাউন্সিল শুধুমাত্র বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম আসাদুজ্জামান বলেন, যদি কোন শিক্ষার্থীর সনদ জাল প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে যে কোন পর্যায়ে তার আইনজীবী সনদ বাতিলের সুযোগ বার কাউন্সিলের রয়েছে। কিন্তু ঢালাওভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফরম বিতরণ বন্ধ রাখা দুঃখজনক। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের যদি কোন অনিয়ম বা জালিয়াতি থাকে তাহলে সরকারের উচিত এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া। তিনি আরো বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান তো সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ছাত্র ভর্তি করছে এবং দালানকোঠা নির্মাণ করে বা ভাড়া নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা তো কোথায় কি দ্বন্দ্ব আছে এসব গোপন তথ্য জেনে ওইসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছেন না। অন্যের অনিয়ম ও দুর্নীতির খেসারত কেন তারা দেবেন? বার কাউন্সিলের উচিত হবে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দেয়া যে, ভবিষ্যতে ওইসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হবে না। তাহলে কোন শিক্ষার্থী আর ওইসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবেন না। কিন্তুু যারা শিক্ষা কার্যক্রম সমাপ্ত করেছেন তাদের শাস্তি দেয়া অমানবিক হবে।
সূত্র মতে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ‘এনরোলমেন্ট’ পরীক্ষার নিবন্ধন ফরম বিতরণ বন্ধ রেখেছে বার কাউন্সিল। এ প্রসঙ্গে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থী মাহমুদুর রহমান মিশন জানান, শুনেছি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে আমাদের ফরম দেয়া হচ্ছে না। তবে যাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে সেসকল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। তিনি বলেন, তাকে তো এমসিকিউ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বার কাউন্সিলের সনদ নিতে হবে। যিনি যোগ্য তিনিই উত্তীর্ণ হবেন, অযোগ্যদের এখানে কোন স্থান নেই। অতএব সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অভিযোগে পরীক্ষায় অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ঠিক নয়।
গ্রীন ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে স্নাতক মোস্তফা আহমেদ দীপু বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা আইন শিক্ষায় ডিগ্রি অর্জন করেছেন তারা জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের অধীনে সহকারী জজ পরীক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন। শুধু ব্যতিক্রম বার কাউন্সিলের ‘এনরোলমেন্ট’ পরীক্ষায় অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে।
আলোচিত ৭ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ধানমন্ডি, উত্তরা, মিরপুর-১০ ও আশুলিয়া শাখা; অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বনানী শাখা, প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের মিরপুর-১ ও উত্তরা শাখা, ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরা শাখা, নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বনানী শাখা, আমেরিকা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মগেট শাখা এবং বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল ক্যাম্পাস অনুমোদিত হলেও শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনার অনুমোদন নেই। এদিকে ওই ৭ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আগামীকাল বার কাউন্সিলের এক বৈঠকে হাজির হতে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে।