রেল লাইনের দুই পাশে অবৈধ বাজার বন্ধ করতে বেষ্টনী দেয়ার সুপারিশ করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। প্রাথমিকভাবে ঢাকা মহানগরী ও আশেপাশের এলাকায় জালের বেড়া দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য স্থানেও এই কার্যক্রম হাতে নিতে বলেছে সংসদীয় কমিটি। আজ রবিবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠক শেষে এতথ্য জানানো হয়।
কমিটি সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী এতে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, রেলমন্ত্রী কমিটিকে জানিয়েছেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম চালু থাকবে। কিন্তু দেখা যায়, উচ্ছেদের পরপরই আবার বাজার বসছে। এ জন্যই কমিটি বেড়া নির্মাণের সুপারিশ করেছে। রেল কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, গত ৯ মাসে শুধু ঢাকাতেই ট্রেনের নিচে পড়ে ২৩৮ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ১৯২ জন পুরুষ এবং ৪৬ জন নারী। তবে এর মধ্যে আত্মহত্যার কয়েকটি ঘটনা রয়েছে। কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে লেভেল ক্রসিংয়ে গাড়ির সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে।
এ দিকে, সংসদীয় কমিটি রেলের মেরামত ও বিদ্যুত্ বিল কমানোর সুপারিশ করেছে। তবে রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের বিদ্যুত্ বিল যৌক্তিক। সংসদীয় কমিটিতে রেল কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে রেলওয়ের রাজস্ব খাতে বরাদ্দ এক হাজার ৯৪৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে মেরামত বাবদ খরচ ৫৮৬ কোটি ৮৬ লাখ ৮০ হাজার, জ্বালানি তেল বাবদ খরচ ২৭০ কোটি এবং বিদ্যুত্ বিল বাবদ খরচ হবে ৭০ কোটি টাকা। আর পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। কমিটি সভাপতি বলেন,বিদ্যুত্ বিল নিয়ে রেল বলেছে তাদের খরচ যৌক্তিক।
এর আগেও সংসদীয় কমিটির বৈঠকে অবৈধ বিদ্যুত্ বিল সংযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কমিটি অবৈধ বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিল কমানোর সুপারিশ করেছে। বৈঠকে রেলমন্ত্রী ছাড়াও ছিলেন কমিটির সদস্য মো. আলী আজগর, মিজানুর রহমান, মো. সিরাজুল ইসলাম মোল্লা ও ইয়াসিন আলী।
বৈঠকে রেলওয়ের লোকোমোটিভ এবং যাত্রীবাহী কোচ কেনা ও মেরামতের বিষয়ে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদীয় কমিটি। তারা প্রতিষ্ঠানটিতে শ্রমিক লীগের নামে নিয়োগ বানিজ্যের ঘটনায়ও ক্ষোভ প্রকাশ করে। সংসদীয় কমিটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রেলের বগি ও কোচ মেরামত করা এবং রেলওয়ের সকল ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়ায় কাজ করাসহ মনিটরিং ব্যবস্থা আরো জোরদার করার বিষয়ে মন্ত্রলায়কে নির্দেশনা দেয়।
বৈঠকে সরকারিদল সমর্থিত রেলওয়ে শ্রমিক লীগের নামে রেলওয়েতে নিয়োগ বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ করেন কমিটির সদস্যরা। তারা বলেন, রেলওয়ে শ্রমিক লীগ নেতারা বিভিন্ন পদে চাকরি দেয়ার নামে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। বৈঠকে জানানো হয়, সম্প্রতি রেলওয়ের বিভিন্ন পদে ৪ হাজার ৯৪টি পদে লোক নিয়োগে দেয়া হয়। এর মধ্যে রেলওয়ে শ্রমিক লীগের নেতৃবৃন্দের দাবির পরিপ্রেক্ষিত্রে চাকরি দেওয়া হয় ৮৯১ জনকে। নিয়োগ বাণিজ্য ছাড়াও প্রভাব খাটিয়ে রেলের জায়গা দখল, বিভিন্ন রেলষ্টেশনে অবৈধ দোকান বাসিয়ে চাঁদা আদায়, রেলের কার্মকর্তা কর্মচারীদের বদলিতে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে রেলওয়ে শ্রমিক লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বলা হয়, টিকেট কালেক্টর, ফার্মাসিস্ট, লষ্কর, চৌকিদার, টিএক্সআর, গুডস সহকারী, এমএলএসএস, ওয়ার্ড এটেন্ডেন্ট, বুকিং সহকারী, কলম্যান, ক্লিনার, খালাসী (স্টার), ট্রলিম্যান, ট্রেন নাম্বার ট্রেকার, ওয়েম্যান, এটেন্ডেন্ট, এএলএম, এমএস, ঘোষক, ফুয়েল চেকার পদে ৮৯১ জনকে নিয়োগ দিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে রেলওয়ে শ্রমিক লীগ নেতৃবৃন্দ।
এর মধ্যে টিকেট কালেক্টর পদে ১০টি, ফার্মাসিস্ট পদে ৭টি, লষ্কর পদে ১২টি, চৌকিদার পদে ৫টি, টিএক্সআর পদে ১২টি, গুডস সহকারী পদে ২টি, এমএলএসএস পদে ৪০টি, ওয়ার্ড এটেন্ডেন্ট পদে ৩১টি, বুকিং সহকারী পদে ৩০টি, কলম্যান ২টি, ক্লিনার ১৪৬টি, খালাসী (স্টার) পদে ১৪টি, ট্রলিম্যান পদে ৪টি, ট্রেননাম্বার ট্রেকার পদে ২টি, ওয়েম্যান ৫৪৬টি, এটেন্ডেন্ট পদে ২৬টি, এএলএম পদে ১৩টি, এমএস পদে ১৭টি, ঘোষক ২টি, ফুয়েল চেকার পদে ১টি।
অভিযোগে বলা হয়, রেলওয়ে শ্রমিকলীগের বর্তমান সভাপতি হুমায়ূন কবিরের চাকুরি শেষ হয়েছে গত আগষ্ট মাসের ১৯ তারিখে। এছাড়া রেলওয়ে শ্রমিকলীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান আখন্দেরও চাকুরীর মেয়াদ শেষ হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগেই। চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তারা অবৈধভাবে রেলওয়ে শ্রমিক লীগের নেতৃত্ব দখল করে নিয়োগ বানিজ্য করে যাচ্ছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ:
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে এ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত এ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে ঘাটতি ও অনিয়মের বিষয়গুলো তদন্ত করারও সুপারিশ করা হয়েছে। গতকাল রবিবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সুপারিশ করা হয়েছে। আব্দুল ওয়াদুদের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, আব্দুল মালেক, হাসিবুর রহমান স্বপন, খন্দকার আবদুল বাতেন, শেখ মো. নূরুল হক ও শিরিন নাঈম এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।