বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনতে বহুল আলোচিত ‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) বিল, ২০১৪’ পাস হতে যাচ্ছে আজ। যেহেতু এটি সংবিধান সংশোধন বিল, সে কারণে ‘হ্যাঁ-না’ কণ্ঠভোটে এটি পাস হবে না। সংবিধান অনুযায়ী গোপন বুথে সরাসরি ব্যালটে স্বাক্ষরের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের ভোট গ্রহণ করা হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট বিলের পক্ষে পড়লে তা পাস হবে।
এদিকে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) বিলটির পক্ষে ভোট দেবে বলে দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিলটি পাসে সমর্থন চেয়ে এরই মধ্যে ১৪ দলের শরিকদের ছাড়াও সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকা দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিল পাসের পরদিন, অর্থাত্ আগামীকাল বৃহস্পতিবার চলতি অধিবেশন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সংবিধান সংশোধনের বিল পাস হওয়ার তিন মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত আইন করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।
সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের দিন আজ সকল সংসদ সদস্য যেন সংসদে উপস্থিত থাকেন, সেজন্য এরইমধ্যে সরকারি ও বিরোধী দল এবং স্বতন্ত্র এমপিদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের সময় কোনো সদস্য সংসদে অনুপস্থিত থাকতে পারবেন না। অনুপস্থিত থাকলে তার সদস্যপদ শূন্য বলে গণ্য হবে। তবে স্পিকার এবং স্ব স্ব দলের সংসদীয় দলের প্রধানের অনুমতি সাপেক্ষে যে কোনো সদস্য ওইদিন অনুপস্থিত থাকতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে তার সদস্যপদ শূন্য হবে না।
বিরোধী দল বিলের পক্ষে ভোট দেবে জানিয়ে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘আমরা বিলের পক্ষে ভোট দেব, দলীয়ভাবে এই সিদ্ধান্ত রয়েছে।’ তিনি জানান, একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নেয়ার জন্য আজ তার বিদেশে যাওয়ার কথা ছিল, তবে সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের বিষয় থাকায় তিনি সেই সফর বাতিল করেছেন।
সংসদের চিফ হুইপ আ.স.ম ফিরোজ জানান, সংবিধান সংশোধন বিল পাসের দিন সংসদে যেন সরকারি দলের সকল সংসদ সদস্য উপস্থিত থাকেন, সেজন্য এরইমধ্যে ‘হুইপিং’ করা হয়েছে। একই কথা জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরীও। তাজুল জানান, স্পিকার ও সংসদীয় দলের প্রধানের অনুমতি ছাড়া কোনো সদস্য অনুপস্থিত থাকলে তার সদস্যপদ থাকবে না, এজন্য সবার উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। বিরোধী দলীয় সদস্যরা যেন সবাই উপস্থিত থাকেন, সেজন্য সবাইকে মোবাইলে এসএমএস পাঠানো হয়েছে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, জাপার কাজী ফিরোজ রশীদ, নূরুল ইসলাম মিলন, ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা, জাসদের মইন উদ্দিন খান বাদল ও শিরীন আকতার, স্বতন্ত্র সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী, হাজী মোহাম্মদ সেলিম ও তাহজীব আলম সিদ্দিকী বিলের ওপর কয়েকটি সংশোধনী দিয়েছেন। ফিরোজ রশীদ তার সংশোধনীতে বিচারপতিদের ‘অসামর্থ্য’ ও ‘অসদাচরণ’ প্রমাণের জন্য ‘জুডিশিয়াল ইনভেস্টিগেশন কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
সংবিধান সংশোধন বিল পাসের নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে বিলটি পাসের প্রস্তাব করবেন আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক। এরপর স্থায়ী কমিটির সুপারিশকৃত বিলটির প্রতিটি উপদফা, দফা, প্রস্তাবনা ও শিরোনাম ভোটে দেবেন স্পিকার। পরে জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে প্রেরণ ও সংশোধনী প্রস্তাবগুলোও স্পিকার ভোটে দেবেন। এই দুটি বিষয় নিষ্পত্তি হবে কণ্ঠভোটে। এরপর বিলটি পাসের প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে লবিতে গিয়ে গোপন বুথে স্বাক্ষর করবেন। স্বাক্ষর গ্রহণ শেষে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করবেন স্পিকার।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিলের ‘দীর্ঘ’ প্রস্তাবনা বাদ দেয়ার পাশাপাশি উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে কিছু পরিবর্তন এনেছে। সংসদে উত্থাপিত বিলে বলা ছিল, “... এই অনুচ্ছেদের ২ দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করিবেন।” সংসদীয় কমিটি এই দফায় পরিবর্তন করে বলেছে, “... সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবেন।” সংসদে উত্থাপিত বিলের প্রস্তাবনাতে ‘ভুল’ থাকায় সেটিও সংশোধন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সাত দিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ওইদিনই বিলটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। ঠিক সাতদিনের মাথায়, গত রবিবার সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সংসদীয় কমিটি গত ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর মাত্র দুটি বৈঠকেই এই প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে।
উল্লেখ্য, সংবিধানের সর্বশেষ সংশোধনী পাস হয়েছিল ২০১১ সালের ৩০ জুন। এটি ছিল পঞ্চদশ সংশোধনী। বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে ওই সংশোধনীর মাধ্যমে। সংসদে বিভক্তি ভোটের মাধ্যমে সেদিন বিলটি পাস হয়েছিল। বিলটির পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ২৯১টি, বিপক্ষে ‘না’ ভোট পড়েছিল মাত্র ১টি। নবম সংসদের একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম ওই ‘না’ ভোটটি দিয়েছিলেন। নবম সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি পঞ্চদশ সংশোধনীর বিরোধিতা করেছিল।