বহুল আলোচিত ‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) বিল, ২০১৪’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। সংবিধানের বর্তমান ৯৬ অনুচ্ছেদের এই সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরিবর্তে ফিরে এলো জাতীয় সংসদের হাতে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদেও সংসদের হাতেই এই ক্ষমতা ছিল। প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ ও বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদসহ দলটির নয়জন এমপি বিলটির ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দিলেও দলের উপস্থিত এমপিরা সবাই বিলের পক্ষেই ভোট দিয়েছেন। গতকাল বুধবার সংসদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারি জোট ১৪ দল, প্রধান বিরোধী দল জাপাসহ অন্যান্য ছোট বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে বিলের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে কোনোরকম বিরোধিতা ছাড়াই বিভক্তি ভোটে নির্বিঘ্নে বিলটি পাস করেন।
পাস হওয়া বিলটিতে বলা আছে, প্রমাণিত অসদাচরণ বা বিচারকাজে অসামর্থ্যের কারণে বিচারকের অপসারণ নির্ধারিত হবে সংসদের ভোটাভুটিতে। সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ছাড়া কোনো বিচারককে অপসারণ করা যাবে না- এমন বিধান সংযোজন করা হয়েছে সংশোধনীতে। বিলের দফা (৩)- এ বলা হয়েছে- কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে মাগরিবের নামাজের বিরতির পর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা ঠিক ৭টায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। এর আগেই প্রায় কানায়-কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায় অধিবেশন কক্ষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ বেশিরভাগ সদস্যই এসময় উপস্থিত ছিলেন। ৭টা ৩৭ মিনিটে স্পিকার সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশকৃত আকারে ‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) বিল, ২০১৪’ সংসদের বিবেচনার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করতে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হককে আহ্বান জানান। বিলটির ওপর আনা জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব এবং বিভিন্ন দফায় আনা সংশোধনী প্রস্তাবসমূহ কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যাওয়ার পর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে সংসদ লবিতে গিয়ে গোপন ব্যালটে স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিলের পক্ষে ভোট দেন। বিলটির শিরোনাম, দফা এবং উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতি স্পিকার পৃথকভাবে ভোটে দিলে প্রত্যেকবারই সংসদ সদস্যরা লবিতে গিয়ে ভোট দেন। ভোট গ্রহণের এই প্রক্রিয়া শেষ হয় রাত ১১টা ৬ মিনিটে। এরপর স্পিকার বিভক্তি ভোটের ফলাফল ঘোষণা করেন। বিলের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে ৩২৮টি, আর বিপক্ষে কোনো ভোট পড়েনি। পরে রাত ১১টা ৭ মিনিটে স্পিকার বিলটি পাস হলো বলে উল্লেখ করেন। এসময় সরকারি ও বিরোধী দলের সবাই একযোগে টেবিল চাপড়ে নিজেদের সমর্থন জানান।
জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব
বিলটির ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর এবং বিভিন্ন দফায় ৩০টি সংশোধনীর প্রস্তাব করেন বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য। জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ, জাপার জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, কাজী ফিরোজ রশীদ, এম এ হান্নান, ইয়াহইয়া চৌধুরী, বেগম রওশন আরা মান্নান, নূরুল ইসলাম মিলন ও পীর ফজলুর রহমান, জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) চেয়ারম্যান এস এম আবুল কালাম আজাদ এবং স্বতন্ত্র সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী, হাজী মোহাম্মদ সেলিম, তাহ্জীব আলম সিদ্দিকী ও আব্দুল মতিন। আবুল কালাম আজাদ ছাড়া প্রতেক্যেই নিজ প্রস্তাবের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বিলটিকে বিতর্কমুক্ত রাখতে জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। তবে তাদের এই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। পরে বিলের বিভিন্ন দফায় আনা সংশোধনী প্রস্তাবসমূহও কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।
প্রমাণিত গুরুতর অসদাচরণ ও বিচারকাজ করতে
অসামর্থ্যের কারণেই কেবল অপসারণ হবে: আইনমন্ত্রী
সদস্যদের জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, প্রস্তাবকারীদের অনেকের প্রশ্ন ছিল- এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে কিনা। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, কোনো হস্তক্ষেপ হবে না। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাসের পরেই কেবল সেটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, বিলে বলা আছে, কেবলমাত্র প্রমাণিত গুরুতর অসদাচরণ ও বিচারকাজ করতে অসামর্থ্যের কারণেই একজন বিচারককে অপসারণ করা যাবে। একজন বিচারক অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। আমরা বলে থাকি, আল্লাহর পরেই বিচারক। সেই কারণে তার হাতের ক্ষমতা ক্ষুণ্ন হোক, আমরা সেটির পক্ষে নই। তিনি বলেন, এই বিলটি পাসের ফলে জনগণের অধিকার, বিচার বিভাগের সম্মান-জবাবদিহিতা-পবিত্রতা-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হবে।
গতকাল দিনটি বুধবার হওয়ায় পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের পর দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী প্রথম ত্রিশ মিনিট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশ্নোত্তর চলে। এরপর মন্ত্রীদের প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত বলে ঘোষণা দেন স্পিকার। দিনের কার্যসূচিতে থাকা কার্যপ্রণালী বিধি ৭১-এ আনা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিসসমূহের কার্যক্রম স্পিকার স্থগিত করেন। এরপর সংবিধান সংশোধন বিল পাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বিলটির প্রেক্ষাপট
১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় উচ্চ আদালতের বিচারকদের পদের মেয়াদ নির্ধারণ ও তাদের সরানোর ক্ষমতা সংসদের হাতে ছিল। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর পর এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে যায়। চতুর্থ সংশোধনী বাতিল হলে জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকারের আমলে এক সামরিক আদেশে বিচারপতিদের অভিশংসনের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করা হয়। গতকাল বিলটি পাসের ফলে এখন আবার সংসদের হাতে বিচারকদের সরানোর ক্ষমতা ফিরলো। তিন মাসের মধ্যে এই সংক্রান্ত আইন করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।
৯৬ অনুচ্ছেদে সংশোধনের প্রস্তাবে যা বলা হয়েছে
বিলে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একজন বিচারক সাতষট্টি বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার অনূন্য দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে রাষ্ট্রপতির আদেশে কোনো বিচারককে অপসারণ করা যাবে। বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করবে। এ ছাড়া কোনো বিচারক রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদত্যাগ করতে পারবেন।
উল্লেখ্য, গত ৭ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সাত দিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ওইদিনই বিলটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। যাচাই-বাছাই শেষে বিলের উপর সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সংসদীয় কমিটি গত ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর মাত্র দুটি বৈঠকেই এই প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে।
এরআগে ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়েছিল। বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে ওই সংশোধনীর মাধ্যমে। সংসদে বিভক্তি ভোটের মাধ্যমে সেদিন বিলটি পাস হয়েছিল। বিলটির পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ২৯১টি, বিপক্ষে ‘না’ ভোট পড়েছিল মাত্র ১টি। নবম সংসদের একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য মোহাম্মদ ফজলুল আজিম ওই ‘না’ ভোটটি দিয়েছিলেন।
আমি ন্যায় বিচার পাইনি: এরশাদ
জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাবের পক্ষে এরশাদ তার বক্তব্যে বলেন, যদি বলি বিলটি সঠিক বা এতে যদি সমর্থন দিই- তাহলে বলা হবে আমরা বিরোধী দল নই। বিলটি না বুঝে এক বাক্যে ‘মানি না, মানব না’ বলে যদি সংসদের বাইরে গিয়ে আন্দোলন-হরতাল করি, গাড়ি ভাংচুর করি, সংসদে গালিগালাজ করি, তাহলে হয়তো বলা হবে আমরা সত্যিকারের বিরোধী দল। কে কী বললেন, কী ভাবলেন - তা আমাদের ভাবার বিষয় নয়। আমরা নীতি-আদর্শের রাজনীতি করি। আমরা মনে করি বিলটি পাস হলে সংসদের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হবে। তিনি বলেন, প্রশ্ন হচ্ছে- বিলটি পাস হলে বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ হবে কিনা? ক্ষমতা ছাড়ার পর আমার বিরুদ্ধে ৭৪টি মামলা হয়েছিল। আমি তো ন্যায় বিচার পাইনি!
তাড়াহুড়োর কারণে সন্দেহ থাকবে: রওশন
এরশাদের পর বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলেন, বিচারকদের অপসারণে বিল পাসে তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে বলে কথা উঠেছে। সবার সঙ্গে আরও বিশদ আলোচনা করে জনমত যাচাই করলে ভালো হতো। তাড়াহুড়ো করলে জনমনে সন্দেহ থাকবে। তিনি বলেন, ক্ষমতা থেকে যাবার পর আমাদের যেভাবে হয়রানি করা হয়েছে তা আর কারও বেলায় হয়নি। একটি অন্যায়ের জন্য আমরা চার রকম শাস্তি পেয়েছি। এটা কী বিচার হলো? তাহলে আইন সবার জন্য সমান হল কীভাবে? আমাদের বেলায় সেটি হল না কেন? একটি জমি কিনে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিল্ডিং করায় আমাদের চার ধরনের শাস্তি দেয়া হয়েছে। এখনও আমরা ন্যায় বিচার পাইনি। আমার প্রশ্ন, কেন পাইনি? রওশন আরও বলেন, বিচারকদের প্রভাবমুক্ত থেকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হলে দেশে আইনের শাসন ও সুশাসন থাকতে হবে।
অন্যরা যা বললেন
জাপার জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, বিলটি আরও অনেক আগেই আনা উচিত ছিল। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরিবর্তে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে আনা সংসদীয় গণতন্ত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে কিনা। আমি মনে করি হবে না। তারপরেও অধিকতর গ্রহণযোগ্যতার জন্য জনমত যাচাই করা প্রয়োজন।
জাপার আরেক সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ’৭২ এর সংবিধানে ফিরে যেতে আপত্তি নেই। তবে এত তাড়াহুড়ো কেন? গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে হলে স্বাধীন বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যম থাকতে হবে। নইলে জনগণের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। এই সংশোধনী নিয়ে ভবিষ্যতে যেন কথা না ওঠে, সেজন্যই জনমত যাচাই দরকার।
জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, সংবিধান প্রণেতাদের যারা এখন এই সংশোধনীর বিরোধিতা করছেন, তারা কেন এই ভুল স্বীকার করেন না যে, সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ রেখে প্রধানমন্ত্রীর হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বিএনএফ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, জনমত যাচাইয়ের জন্য এই সংসদই যথেষ্ট। তাছাড়া জনমত যাচাই এক জিনিস, আর বিরোধিতা আরেক জিনিস। সংবিধান প্রণেতাদের কেউ কেউ আজ কি করছেন সেটি বিবেচনার দাবি রাখে। ঝিনাইদহ-২ আসনের স্বতন্ত্র সদস্য তাহ্জীব আলম সিদ্দিকী বলেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উত্স জনগণ। সংবিধান সংশোধনের পর বিচারকদের অপসারণে ভবিষ্যতে আইন হবে। এনিয়ে জনমনে শঙ্কা-উদ্বেগ কাজ করছে। এই উদ্বেগ কাটাতে আইনের সঙ্গে বিচারকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। যাতে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে। এছাড়া বিচারকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। স্বতন্ত্র সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, বিলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এনিয়ে আইনবিদ এবং ’৭২ এর সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে যুক্তদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। কারণ বিলটি নিয়ে এরইমধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
বাছাই কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাব
সংবিধান সংশোধন বিলটি বাছাই কমিটিতে পাঠিয়ে রিপোর্ট প্রদানের জন্য প্রস্তাব করেন ৮ জন সংসদ সদস্য। এর মধ্যে রুস্তম আলী ফরাজী চলতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৫ জন সংসদ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন। একই প্রস্তাব করেন স্বতন্ত্র সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী, জাপার এমএ হান্নান, ইয়াহইয়া চৌধুরী ও আবদুল মতিন এবং বিএনএফের এসএম আবুল কালাম আজাদ। এছাড়া ৩ সদস্যের কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন জাপার রওশন আরা মান্নান। আর ৬ জন সংসদ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন স্বতন্ত্র এমপি হাজী সেলিম।
দফায় সংশোধন প্রস্তাব
বিলটি সম্পর্কে স্থায়ী কমিটির রিপোর্টের ১ দফায় সংশোধনী এনেছেন মোট ৩ জন সংসদ সদস্য। এদের মধ্যে রুস্তম আলী ফরাজী বিচারপতিদের বয়স ৭০ বছর করার প্রস্তাব করেছেন। এছাড়া হাজী সেলিম ও এম এ হান্নান দফা ১ এর উপর সংশোধনী আনেন। দফা ২ এর উপর সংশোধনী আনা হয় ২৭টি। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী দফা ২ এ প্রস্তাব করেন, ‘বিচারকদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও অসামর্থ্যের কোন প্রস্তাব সংসদে উত্থাপিত হলে সংসদের নূন্যতম ১০০ জন সদস্যের উক্ত প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন থাকলে প্রস্তাবটি সরাসরি সংসদ কর্তৃক গঠিত জাজেস ইনকোয়ারি কমিশনে প্রেরিত হবে এবং সংসদ উক্ত কমিশনের তদন্ত রিপোর্টের মাধ্যমে প্রমাণিত অসদাচরণ ও অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যার অনূন্য দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোন বিচারপতিকে অপসারণ করা যাবে না।’
তিনি দফা (২) এর প্রস্তাবিত উপ-দফা (৪) এর পর নতুন উপ-দফা (৫) সন্নিবেশের প্রস্তাব করেন। রুস্তম আলী ফরাজী তার প্রস্তাবিত ৫ উপ-দফায় বলেন, ‘এই আইনটি কার্যকর হবার পর অনতিবিলম্বে উচ্চ আদালতের বিচারকদের নিয়োগের নীতিমালা তৈরি করা লক্ষ্যে ‘বিচারক নিয়োগ কমিশন’ গঠন করিবেন।’
এছাড়া সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, মুস্তফা লুত্ফুল্লাহ, টিপু সুলতান, শেখ হাফিজুর রহমান, ইয়াসিন আলী, নাজমুল হক প্রধান এবং শিরীন আখতার বিলের ২ দফায় প্রস্তাবিত উপ-দফা (৩) এর তৃতীয় পঙক্তিতে অবস্থিত ‘নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবেন’ শব্দাবলীর পরে ‘এবং একই সঙ্গে সংসদ বিচারক নিয়োগের নীতিমালা প্রণয়ন করিতে পারিবেন’ শব্দাবলী সন্নিবেশের প্রস্তাব করেন।
কিছু ডক্যুমেন্ট সরবরাহ
গতকাল সংসদে বিলটির পক্ষে সংশ্লিষ্ট কিছু ডক্যুমেন্টও সরবরাহ করা হয়েছে সংসদ সদস্যদের। এর মধ্যে ছিল সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের বিষয়ে ১৯৭৮ সালে জারিকৃত সামরিক ফরমান, ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে তুলনামূলক একটি চিত্র এবং বিভিন্ন দেশে প্রচলিত এই সংক্রান্ত আইন বা সংবিধান।
সংসদে শব্দ বিভ্রাট
এদিকে বিলটি নিয়ে আলোচনার সময় মারাত্মক শব্দযন্ত্র বিভ্রাটের ঘটনা ঘটেছে। জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ যখন বিলের জনমত যাচাই-বাছাইয়ের প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য রাখছিলেন এসময় বিকট শব্দ করে শব্দযন্ত্র বিকল হয়। সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারাসহ স্পিকারের নিরাপত্তায় থাকা দায়িত্বরতরা দৌড়াঝাঁপ শুরু করেন। রাত ৮টা ২৮ মিনিট থেকে এই শব্দ বিভ্রাট শুরু হয়। প্রায় ৩ মিনিট বিকল থাকার পর বিকল্প ব্যবস্থায় বক্তব্য দেন এরশাদ, বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ অন্যান্যরা।