সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে যা-যা বললেন রওশন

 
 
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ বলেলেন, ‘আপনি সারা দেশের প্রধানমন্ত্রী, আপনি তো শুধু আওয়ামী লীগের প্রধানমন্ত্রী নন। সে জন্য সারাদেশের মানুষের কথাই আপনাকে চিন্তা করতে হবে। না করলে চলবে কী করে। মানুষকে ফরমালিনযুক্ত খাদ্যের নামে বিষ খাওয়ানো বন্ধ করতে না পারলে আপনি বঙ্গবন্ধু কন্যা হলেন কী করে! ’৭২ এর ফরমালিন বিরোধী আইনটি আপনি কেন ফিরিয়ে আনছেন না? আপনি মানুষকে ভালোবাসেন না? মানুষের ভালো চান না? আপনি ইচ্ছা করলে তো একদিনেই ফরমালিন বন্ধ করতে পারেন। তাহলে করেন না কেন? আপনাকে যে কথাগুলো বললাম সেগুলো গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। না ভাবলে চলবে না।’ বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এ সব কথা বলেন। তার এই বক্তব্যের সময় প্রধানমন্ত্রী সংসদেই উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য শুনছিলেন, হাসছিলেন আর নোট নিচ্ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরো বলেন ‘আপনি একদিন ঘর থেকে বের হয়ে নিজ চোখে দেখুন, মানুষ কী ভাবে থাকে, দুর্গন্ধের মধ্যে কী খায়। এটা আপনাকে করা দরকার। এই খারাপ কথাগুলো তো আপনাকে কেউ বলবে না। সবাই নিজের গা বাঁচিয়ে চলেন। মানুষ বিদ্যুতের অভাবে ভোগান্তি সহ্য করছে, তিন-চার বেলা করে লোডশেডিং হয়। প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে তো বিদ্যুত্ যায় না, জনগণের ভোগান্তি আপনি বুঝবেন কী ভাবে। ঢাকা শহরের বস্তিগুলোতে কত অপকর্ম হচ্ছে, খোঁজ রাখেন। এখানে ৪ হাজার ৬০৩টি বস্তি আছে। প্রতিবছর ৪৫ লাখ লোক নতুন করে ঢাকায় আসে। পাঁচ বছর পর ঢাকা একটি মৃতনগরীতে পরিণত হবে।’
কারাগারের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে রওশন বলেন, আমাদের মতো তো কাউকে জেলে যেতে হয় না, তাই কারাগার নিয়ে কারো মাথাব্যাথ্যা নেই। আমাকে যখন কারাগারে নেয়া হয় তখন শুধু একটি কম্বল দেয়া হয়েছিল। সারা দিন একটি কলা ও একটি বিস্কুট দেয়া হয়েছিল। ওই অবস্থায় সাত দিন না খেয়ে মাটির বিছানায় ছিলাম। না খেয়ে থাকায় ১০৬ ডিগ্রি জ্বর উঠে, ইনফেকশন হয়। একটি অন্যায়ের জন্য চার রকম শাস্তি পেয়েছি। বলা হয়েছিল, দেশ থেকে আমরা চলে গেলে মামলা হবে না। গেলে বল তো, দেশ ছেড়ে চলে গেছি। মামলার পর মামলা দেয়া হয়েছে। এটা কেন?
তিনি বলেন, দেশের মহাসড়কগুলো চলাচলের অযোগ্য। সড়কগুলোর বেহাল অবস্থা। রাজধানীতে ঢাকা সিটি করপোরেশনের অধীনে ২ হাজার ২৮৯ কিলোমিটার রাস্তা রয়েছে। রাস্তার সংখ্যা ৪ হাজার ১০৭টি। এর মধ্যে কিছু ভিভিআইপি, কিছু ভিআইপি। ৬০ শতাংশ রাস্তা চলাচলের অযোগ্য। মানুষ অতিকষ্টে রাস্তা পারাপার হচ্ছে। রাস্তাগুলো ভেঙ্গেচুরে এমন অবস্থা যে দূর থেকে মনে হয় যেন কোনো পুকুর বা ডোবা। এগুলো মরণফাঁদ। ডোবা না ম্যানহোল, দূর থেকে বোঝার উপায় নেই। ঢাকায় নিত্য যানজট লেগেই থাকে। ঢাকা এখন চলাচলের অযোগ্য। যানজটে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, অর্থ ও সময় নষ্ট হচ্ছে।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, বিদ্যুত্ ও গ্যাস খাতে লুটপাট থামছেই না। বিদ্যুত্ খাতে দেড় হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। বিল জালিয়াতিসহ আরও বিভিন্নভাবে আড়াই হাজার কোটি টাকার অপচয় হয়েছে সরকারের। গার্মেন্টস শিল্পে ২ লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছেন। এখানে রাস্তা নাই, বিদ্যুত্-গ্যাস-পানি নেই। তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে কী ভাবে!
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে রওশন এরশাদ বলেন, বড় লোকেরা ব্যাংক থেকে হাজার-হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেন না। আর গরিব কৃষকদের সরকার ঋণ দিতে পারে না। এবারের বন্যায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনে বিনাসুদে ঋণ দেয়া উচিত। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, স্পিকার, সংসদ উপনেতা ও কৃষিমন্ত্রীসহ অনেকে মহিলা হলেও এখনো দেশে নারীরা প্রতিনিয়ত নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। বিশেষ করে তারা যৌতুক, এসিড নিক্ষেপ ও ইভ টিজিংয়ের শিকার হচ্ছে, নির্যাতিত নারীরা আত্মহত্যা করছে। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী, এই জীবন থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে, আপনার-আমার দরকার নেই, কিন্তু তরুণ প্রজন্মের জন্য দরকার আছে। আমাদের সামনে মেয়েরা এভাবে নির্যাতিত হবে— এটা হতে পারে না।
সংসদে উপস্থিত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে উদ্দেশ্য করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘এই যে, অর্থমন্ত্রী, কিছু কোম্পানি ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে মেরে দিয়েছে। ব্যাংকের টাকা মারাই যেন ব্যবসা। অর্থমন্ত্রী আপনি দেখছেন, ব্যাংকগুলোর কি বেহাল দশা। আপনি আমার কথাগুলো শোনেন। কিছু কোম্পানি ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। এগুলো যেন আল্লাহর ওয়াস্তে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তাদের ধরেন না কেন? কখনো তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন? কৃষক ব্যাংকের ঋণ দিতে না পারলে আপনারা কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে আসেন। এগুলো কেন হচ্ছে। এই টাকার কোনো হদিস নেই। নামে-বেনামে ঋণ নেয়া হয়েছে। এই টাকা উধাও, যারা নিয়েছে তারা দেশেও নেই।