একি নৃত্য নাকি শরীরী শৈলী, নাকি অভিনয়। যাই বলুন না কেন ভুল বলা যাবে না। আকরাম খান- শিল্পকলার প্রাচীনতম মাধ্যম নৃত্যের সবচেয়ে আধুনিক পরিবেশনা তুলে ধরলেন বাংলাদেশের দর্শকদের সামনে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে নৃত্যশিল্পী আকরাম খানের গল্প বলাই ছুঁয়ে গেল প্রতিটি দর্শকের হূদয়। ভিন দেশ থেকে এসে বাংলাদেশে নিজের জন্মভূমির স্বরূপ সন্ধানের কাহিনীই বললেন আকরাম খান। সেই গল্প, সুনিপুণ কোরিওগ্রাফি আর অনন্য লেজার শো মাত করে দিল প্রতিটি দর্শকের হূদয়। বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য এ পরিবেশনা এক নতুন অভিজ্ঞতা।
মূলত যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে ভ্রমণকালে দুই দেশের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে পরাবাস্তব পৃথিবীর যোগসূত্র স্থাপন করেছেন আকরাম খান। উঠে এসেছে মানুষের লড়াই, মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা। উঠে এসেছে দেশ।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এ নাগরিকের শরীরী শৈলী বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। শুক্রবার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অবাক বিস্ময়ে পিনপতন নিরবতায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট বুঁদ হয়ে দেখলেন আকরাম খানের সারা পৃথিবীতে সাড়া জাগানো একক নৃত্যনাট্য ‘দেশ’। ব্রিটিশ কাউন্সিলের এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে শিল্পকলা একাডেমি ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশন।
নৃত্যনাট্যে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে পরাবাস্তব পৃথিবীর যোগসূত্র স্থাপন করেছেন আকরাম খান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন আমন্ত্রিত অতিথিরা।
আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির যুুগে সংলাপ ছাড়াও আলো প্রক্ষেপণ ও গ্রাফিক্সের ভাষা কতটা শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত তারও প্রমাণ মিললো তার এই অসাধারণ নৃত্যনাট্যে। ‘দেশ’ নৃত্যনাট্যে স্থান পেয়েছে কবি শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কবিতার অংশ, স্থান পেয়েছে ‘রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়’ এর মত বাঙালির সাহসী স্লোগান। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটেনের লেস্টারে ও অক্টোবরে লন্ডনের শেডলার ওয়েলস থিয়েটারে ‘দেশ’ প্রদর্শনের পর প্রশংসিত হয় ব্রিটেনের সারা বিশ্বের নৃত্যাঙ্গনে। পাশ্চাত্য ধারণা নিয়েই শুধু নয়, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ নিয়েও যে নৃত্যনাট্য তৈরি করা যায়, তা-ই হাতেনাতে প্রমাণ করেন আকরাম খান।
শুধু ‘দেশ’ সৃষ্টির পর নয়, এর আগ থেকেই ব্রিটিশ মিডিয়া তাকে নিয়ে সরব ছিল। ২০০২ সালে ব্রিটেনের আইটিবিতে আকরাম খানকে নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়। ২০০৮ সালে বিবিসি ও ২০১০ সালে চ্যানেল- ফোর তাকে নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি করে। সৃষ্টিশীল কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পারফর্মিং আর্টস অ্যান্ড লিটারেচারে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান পাওয়া আকরাম খান তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতোমধ্যে পেয়েছেন সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি। ব্রিটেনের রাণীর কাছ থেকে পেয়েছেন এমবিই খেতাব। ২০১২ এর অলিম্পিকে কোরিওগ্রাফার হিসাবে পারফর্ম করার জন্য বিশ্বের ৬ হাজার প্রতিযোগী থেকে বাছাই করে ৫০ জনকে নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে আকরাম ছিলেন একজন।
২২টি দেশ মাতিয়ে এবার মাতৃভূমি বাংলাদেশে এসে নৃত্যনাট্য ‘দেশ’ পরিবেশন করলেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশী নৃত্যশিল্পী। শরীর ও কণ্ঠের শৈলীতে ফুটিয়ে তোলেন ভূমির গল্প, জাতির গল্প, প্রতিরোধের গল্প, জন্মভূমির গল্প। যার মধ্য দিয়ে মানুষ এ পৃথিবীতে নিজ অস্তিত্ব বজায় রাখতে তত্পর।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বুকে-পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’ স্লোগান লিখে যে তরুণ প্রাণ দিয়েছিল, সেই নূর হোসেনকে নিয়েও একটি চরিত্র ছিল এই নৃত্যনাট্যে। ‘রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়’ উত্তাল একাত্তরের চেতনাদীপ্ত স্লোগানকে উপজীব্য করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের খানিক অংশ তুলে ধরেন আকরাম খান তার কোরিওগ্রাফির মধ্য দিয়ে।
দ্বিতীয় প্রদর্শনী আজ শনিবার একই মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে। এদিনও থাকছে না কোনো টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা। শুধু আমন্ত্রিত দর্শক-শ্রোতারাই উপভোগ করতে পারবেন এই প্রদর্শনী। নৃত্যনাট্যটি প্রযোজনা করেছে শীর্ষস্থানীয় নৃত্যগোষ্ঠী আকরাম খান কোম্পানি।