আসন্ন কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে অধিক মুনাফার আশায় নিষিদ্ধ ডাইক্লোফেন ও স্টেরয়েড হরমোন জাতীয় ইনজেকশন প্রয়োগ করে দেদারসে গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত স্টেরয়েড দিয়ে অল্প সময়ে গরু মোটাতাজা করতে গিয়ে একদিকে যেমন প্রাণীর স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে এসব গরুর মাংস মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। দীর্ঘমেয়াদে শুধু পঙ্গুত্ব বরণই নয়, কিডনি, লিভার নষ্ট ও বন্ধ্যাত্বসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তারা। ফলে কোরবানীর গরু কেনা নিয়ে শঙ্কিত ক্রেতারা।
এ ব্যাপারে গতকাল সোমবার পশুর শরীর পরীক্ষায় ঢাকা মহানগরীর কোরবানীর হাটে চিকিত্সক নিয়োগের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়েছে। একটি মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এ রিট করেছেন। তিনি বলেন, কোরবানীর পশুর শরীরে মানুষের জন্য ক্ষতিকর কোন উপাদান আছে কিনা তা জানতে চিকিত্সক নিয়োগের আবেদন করা হয়েছে। আগামী ৩ থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন হাটে চিকিত্সক নিয়োগে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
রিট আবেদনে ক্ষতিকর ওষুধের মাধ্যমে মোটাতাজা পশু কোরবানীর হাটে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার পাশাপাশি মোটাতাজাকরণ ওষুধ ব্যবহার বন্ধে নীতিমালা তৈরির জন্য ৭ দিনের মধ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতেও নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। আবেদনে মাত্রাতিরিক্ত মোটাতাজাকরণ ওষুধ ব্যবহার বন্ধে নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষায় ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং অবৈধ ওষুধ ব্যবহার বন্ধে কার্যকর নির্দেশনা কেন দেয়া হবে না মর্মে রুল জারির আর্জি জানানো হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, পশুসম্পদ আইন-২০১০-এ ডাইক্লোফেন ও স্টেরয়েড হরমোন জাতীয় ইনজেকশন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলেও অধিক লাভের আশায় অসাধু খামারিরা তা ব্যবহার করছেন। দেশে গরুর খামারের কোনো নিবন্ধন না থাকায় কতটি খামার রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। খামারগুলো কিভাবে গরু প্রতিপালন করছে তা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। এ সুযোগে অসত্ ব্যবসায়ীরা নিষিদ্ধ ডাইক্লোফেন ও স্টেরয়েড হরমোনজাতীয় ইনজেকশন প্রয়োগ করে গরু মোটাতাজা করছেন।
প্রতি বছর কোরবানীর ঈদে সারাদেশে ২৫ থেকে ৩০ লাখ গরু ও প্রায় ৬০ লাখ ছাগলের চাহিদা রয়েছে। এসব প্রাণীর এক-চতুর্থাংশই নিষিদ্ধ ওষুধে মোটাতাজা করা হয়। এই ক্ষতিকর ইনজেকশনের প্রভাব এতটাই যে, মাত্র এক সপ্তাহে একটি গরুর ওজন ১৫ কেজির বেশি বাড়ে। ইনজেকশন দেয়ার ফলে গরুর কিডনি ও যকৃতের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে গরুর শরীর থেকে পানি বের হতে পারে না। এই পানি সরাসরি গরুর মাংসে চলে যায়। এতে গরু ফুলে যায়। দেখে মোটাতাজা মনে হয়। ক্রেতারাও আকৃষ্ট হয় । ফলে বিক্রি হয় ভালো দামে।
প্রতি বছরই ক্রমান্বয়ে অসাধু উপায়ে এই গরু মোটাতাজাকরণ বাড়ছে। এ ব্যাপারে চিহ্নিত জেলাগুলোতে সতর্ক নজর রাখতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে নির্দেশ দেয়া হলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। দেশের মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, নোয়াখালী, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, মাদারীপুর, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর জেলার খামারগুলোতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গরু মোটাতাজা করা হয়— যার অধিকাংশই ক্ষতিকর স্টেরয়েড প্রয়োগসহ অসাধুভাবে মোটাতাজা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী যশোর, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলাতে ভারতীয় গরু ডাইক্লোফেন ও স্টেরয়েড হরমোন জাতীয় ইনজেকশন প্রয়োগ করে মোটাতাজা করা হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক অজয় কুমার রায় বলেন, দেশের কোথাও ক্ষতিকর ইনজেকশনের মাধ্যমে পশু মোটাতাজার খবর পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে বলে তিনি জানান।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মোটাতাজাকরণের পর প্রথমে এসব গরু খামারিরা বেশি দামে বেপারীদের কাছে বিক্রি করে। বেপারীরা আরো বেশি দামে বিক্রির জন্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাটে তা পাঠিয়ে দেন। পশু চিকিত্সকেরা জানিয়েছেন, ডাইক্লোফেন ও স্টেরয়েড হরমোন জাতীয় ইনজেকশন প্রয়োগ করে যেসব গরু মোটাতাজা করা হয় সেসব গরু অস্বাভাবিক মোটা হয়, সবসময় একটা নিস্তেজ ভাব থাকে। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারে না। এমনকি খাবারও ঠিকমতো খেতে চায় না। এসব গরুর পেছনের দিকে উরুর পেশীবহুল জায়গায় আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে তা দেবে যাবে। কারণ বাইরে থেকে মাংস মনে হলেও মাংসের সাথে ব্যাপক পরিমাণে পানি থাকে। কৃত্রিমভাবে মোটাকরা এসব গরু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাই না করলে মারা যায়। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী উত্পাদন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, একটি গরুকে দ্রুত মোটাতাজাকরণের জন্য ডেক্রামিথাসন, কোর্টিসল, বিটামিথাসন, হাইড্রোকর্টিসন ও প্রেডনিসলন ব্যবহার করা হয়। এসব ইনজেকশন একটি বাড়ন্ত ষাঁড় গরুকে প্রয়াজনের তুলনায় ৫ থেকে ১০ গুণ দেয়া হয়।
তিনি বলেন, স্টেরয়েড মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে গরুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এতে প্রাণীটি যেমন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়, তেমনি এসব ওষুধ প্রয়োগে গোশতের গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেন, এসব গরুর মাংস খাওয়ার পর তাত্ক্ষণিকভাবে কোন সমস্যা অনুধাবন করতে না পারলেও দীর্ঘমেয়াদে মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের সৃষ্টি করে। এসব হরমোন এতটাই মারাত্মক যে, মাংস রান্নার পরও তা নষ্ট হয় না। স্টেরয়েড মানুষের কিডনি, লিভারসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর অঙ্গে রোগ সৃষ্টি করে। অনেক সময় বন্ধ্যাত্ব, মেয়েদের অল্প বয়সে পরিপক্বতা এবং শিশুদের অল্প বয়সে মুটিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ স্টেরয়েড হরমোন।
বৈজ্ঞানিকভাবে গরু মোটাতাজা করলে গরুর স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, মাথা উঁচু, শরীর টানটান, তীক্ষ থাকবে। তাই গরু কেনার সময় ওজনে ভারী, ফোলা ও চর্বি জাতীয় গরু না কেনার পরামর্শ দিয়েছেন পশু চিকিত্সকরা।