‘ফরমালডিহাইড মিটার জেড-৩০০ নামক যন্ত্রটি ফল, মাছসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণের জন্য তৈরি করা হয়নি। তবে এটি বাতাসে ক্ষতিকর কেমিক্যাল (রাসায়নিক) আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)। হাইকোর্টের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে করা এক পরীক্ষণ প্রতিবেদনে এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে যন্ত্রটির প্রস্তুতকারক কোম্পানির ব্যবহারবিধি ও ওয়েবসাইটের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এনভার্নেমন্টাল সেন্সর নামের এক কোম্পানির তৈরি করা ‘জেড ৩০০’ মডেলের ‘ফরমালডিহাইড ভ্যাপর মিটার’ যন্ত্রটি পরিবেশ ও বাতাসে ফরমালডিহাইডের বাষ্প মাপার ‘সংবেদনশীল যন্ত্র। এর মাধ্যমে বাতাসে ফরমালডিহাইড গ্যাসের পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব। অথচ এই যন্ত্রের মাধ্যমেই ফলসহ খাদ্যে ফরমালিন পরিমাপ করা হচ্ছে। এই যন্ত্র ব্যবহার করে খাদ্যে ফরমালডিহাইডের পরিমাণ জানার কোনো ‘অ্যাপ্লিকেশন নোট’ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান দেয়নি। তবে এই যন্ত্র ব্যবহার করে খাদ্যের ফরমালডিহাইড পরিমাপ করতে হলে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ্লিকেশন ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে যন্ত্রটির উন্নয়ন ঘটিয়ে ফুড অ্যাপ্লিকেশন নোট সরবরাহ করা প্রয়োজন বলে মত দেয় বিসিএসআইআর।
খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন রয়েছে কি-না তা নিশ্চিত হতে ভ্রাম্যমাণ আদালত ফরমালডিহাইড মিটার নামক যন্ত্রটি ব্যবহার করে। প্রকৃতপক্ষে এই যন্ত্রটি ফরমালিন পরীক্ষায় ব্যবহূত হয় কিনা তা নিশ্চিত হতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাধন চন্দ দাশ ও সেক্রেটারি সিরাজুল ইসলাম। এই রিটের ওপর শুনানি নিয়ে গত ২১ জুলাই বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. হাবিবুল গণির ডিভিশন বেঞ্চ যন্ত্রটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বিসিএসআইআর, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) মহাপরিচালক এবং ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির পরিচালককে নির্দেশ দেয়া হয়। আদালতের আদেশে যন্ত্রটি পরীক্ষা করে সোমবার সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করে বিসিএসআইআর। বাকি দুইটি সংস্থা এখনো তাদের প্রতিবেদন দেয়নি।
বিসিএসআইআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, নমুনা হিসাবে বাজার থেকে আম, মাল্টা, লাল আঙুর, খেজুর ও আপেল সংগ্রহ করেও পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। এতে সংগ্রহ করা ফলের নমুনা ৫ শতাংশ ফরমালডিহাইড-এর দ্রবণে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে কক্ষ তাপমাত্রায় শুকানো হয়। তারপর দ্রবণ মেশানো ফল এবং ‘ফ্রেশ’ ফল পলিথিন ব্যাগে ভরে কিছুক্ষণ রেখে ব্যাগের ভেতরের বাতাসে ফরমালডিহাইড পরীক্ষা করা হয়। নমুনা পরীক্ষায় দেখা যায়, এই যন্ত্রটি ভেজানো ফল ও ফ্রেশ ফলের ফরমালডিহাইডের যে পরিমাণ দেখায় তা সময়, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার উপর নির্ভরশীল। উষ্ণ তাপমাত্রায় ফ্রেশ ফলেও অধিক ফরমালডিহাইডের পরিমাণ দেখায়। তাই ফল উষ্ণ থাকলে এই যন্ত্র ফরমালডিহাইডের পরিমাণ সম্পর্কে ভুল তথ্য নির্দেশ করতে পারে। এতে বলা হয়, ফরমালডিহাইড জেড-৩০০ মেশিনটি বাতাসে কোন ক্ষতিকর কেমিক্যাল আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে পারে। কিন্তু ফলে বা খাদ্যে মেশানো ক্ষতিকর দ্রব্য পরীক্ষার জন্য এটা তৈরি করা হয়নি। এসিটোন, ফরমিক এসিড, এসিটিক এসিড ও মিথানলের উপস্থিতিতেও যন্ত্রে ফরমালডিহাইডের উপস্থিতি দেখাতে পারে। এসব রাসায়নিক প্রাকৃতিকভাবেই ফরমালডিহাইডের মতো রাসায়নিক উপাদান তৈরি করতে পারে। এ কারণেও ওই যন্ত্র ভুল তথ্য দেখাতে পারে।
প্রতিবেদন সম্পর্কে রিটকারীর আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, ফরমালডিহাইড ৩০০ নামক যন্ত্রটি ত্রুটিযুক্ত। ফলে এই যন্ত্র দিয়ে বিভিন্ন বাজারে ফরমালিন পরীক্ষা করা হচ্ছে তা সঠিক ছিল না। এখন আমরা এই রিপোর্ট সংযুক্ত করে আদালতের অবকাশের পরে আবেদন করবো। আবেদনে ত্রুটিযুক্ত যন্ত্র বাতিল এবং এই ফরমালডিহাইড -৩০০ দিয়ে কত হাজার মণ ফল নষ্ট করা হয়েছে তারও হিসেব জানার জন্য প্রার্থনা করা হবে।