চলে গেলেন আয়েশা ফয়েজ



চলে গেলেন আয়েশা ফয়েজ। নন্দিত কথাসাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও আহসান হাবীবের মা রত্নগর্ভা আয়েশা ফয়েজ শনিবার সকালে রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি... রাজেউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। তিনি নিজেও একজন সাহিত্যিক ছিলেন।
দেশসেরা সাহিত্যিকদের জন্ম দেয়া এই জননীর জীবনও গল্পের চেয়ে কম নাটকীয় ছিল না। তার জীবনটাই যেন এক অনন্য ইতিহাস। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তার স্বামী ফয়জুর রহমান শহীদ হন। এরপর সন্তানদের নিয়ে তার জীবন-সংগ্রাম, মানুষের লড়াইয়ের এক অনবদ্য উপাখ্যান। এছাড়াও তার তিন মেয়ে সুফিয়া হায়দার, মমতাজ শহীদ ও রোখসানা আহমেদও নিজ নিজ ক্ষেত্রে দেখেছেন সফলতার মুখ।
তার জীবনে বারবার আঘাত এসেছে আর তিনি যেন প্রকৃতির মতো সহনশলি হয়ে সব ঝড় সামাল দিয়েছেন। কিন্তু জীবনের শেষ ঝড়ে ভেঙে পড়েন তিনি। বড় ছেলে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর তিনি খুবই ভেঙে পড়েন। মুহম্মদ জাফর ইকবালের স্ত্রী ইয়াসমিন হক জানান, মায়ের সামনে সন্তানের মৃত্যুর শোক তিনি সামলাতে পারছিলেন না।
আয়েশা ফয়েজের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বাণী দিয়েছেন। এছাড়াও শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর প্রমুখ।
আয়েশা ফয়েজের মেঝ ছেলে মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘আম্মা বেশ কিছুদিন ধরে হৃদযন্ত্র ও কিডনিসহ বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার সকাল সাতটায় তিনি মারা যান।’
তিনি বলেন, ‘তিনি শুধু আমাদের পাঁচ ভাইবোনের মা ছিলেন না। তিনি হাজারও সন্তানের মা। জীবনের অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে তিনি আমাদের মানুষ করেছেন। আমাদের বুকে আগলে রেখেছেন।’
জাফর ইকবাল বলেন, ‘মোহনগঞ্জে আমার বাবার কবর রয়েছে। সেখানে আমার নানী অর্থ্য্যাৎ মায়ের মা’র কবর রয়েছে। সেখানেই রবিবার তাকে দাফন করা হবে।’
আয়েশা ফয়েজ ল্যাবএইড হাসপাতালে আমৃত্যু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বরেণ চক্রবর্তীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আয়েশা ফয়েজ কিডনিসহ রোগজনিত সমস্যায় বেশি ভুগছিলেন। শরীরে লবণ একদমই থাকছিল না। মাস ছয় আগেও একবার তিনি এ সমস্যায় পড়েছিলেন। তখন তার একবার কিডনি ডায়ালাইসিস করা হয়েছিল। এমনিতে তিনি ছিলেন হার্টের বাইপাসের রোগী। এ ছাড়া ডায়াবেটিস এবং বার্ধক্যজনিত সমস্যা ছিলই। তারপরও শরীরের নানাদিক পরীক্ষা করে ১৩ সেপ্টেম্বর শুক্রবার তার কিডনির ডায়ালাইসিস করা হয়েছিল।’
আয়েশা ফয়েজ ১৯৩০ সালের ২৩ মার্চ নানাবাড়ি নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টার কৈলাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম শেখ আবুল হোসেন ও মায়ের নাম খায়রুন নেসা। ১৯৪৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। স্বামী ফয়জুর রহমান একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। স্বামীর মৃত্যুর পর সংগ্রামমুখর এক জীবনের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। স্বাধীনতার পর তিনি ছয় ছেলেমেয়ে নিয়ে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত জীবন শুরু করেন রাজধানী ঢাকায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে সহায়-সম্বলহীন এই জননী বুক আগলে সন্তানদের লালন-পালন করেন। সেই সংগ্রামের ফসল হিসিবে একদিন সন্তানরা পরিণত কীর্তিমান মানুষে। তাঁর ছয় ছেলেমেয়ে হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদ, সুফিয়া হায়দার, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, মমতাজ শহীদ, আহসান হাবীব ও রোখসানা আহমেদ। তাঁরা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বড় ছেলে হুমায়ূন আহমেদ ২০১২ সালের ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আয়েশা ফয়েজ নিজেও একটি গ্রন্থ লিখেছেন। আÍজৈবনিক এ গ্রন্থের নাম ‘জীবন যে রকম’।