আদিবাসীদের জমি দখলে একের পর এক মামলা

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার পালশা ইউনিয়নের বেলওয়া গ্রামের আদিবাসী ঠাকুর হাসদা (৬২) জানান, তাঁর বাবা দালেল হাসদা ও চাচা স্বরূপ হাসদার নামে বেলওয়া মৌজায় ১১ একর ৫৮ শতক জমি ছিল। ২০১০ সালে নুরু মিয়া(৪৫) ও সাইফুল ইসলাম (৪২) হঠাৎ জানান, ১৯৭৮ সালে তাঁরা দুটি দাগের ১ একর ৭৭ শতক জমি বিন্নাগাড়ি গ্রামের মৃত সিংরাই সাঁওতালের ছেলে ঠাকুরের সাঁওতাল নামের এক আদিবাসীর কাছ থেকে কিনেছেন। এর পর থেকে জমিটি দখলে নিতে তাঁরা চার বছরে দিনাজপুর আদালতে পাঁচটি এবং ঘোড়াঘাট থানায় চারটি ‘মিথ্যা’ মামলা দিয়ে হয়রানি করে আসছেন।

সাইফুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘২০-২২ বছর আগে বিন্নাগাড়ি গ্রামের মৃত সিংরাই সাঁওতালের ছেলে ঠাকুরের সাঁওতালের কাছ থেকে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জমিটি আমরা দুই ভাই কিনেছি। আমাদের স্থানীয় কিছু শত্রুর ইন্ধনে আদিবাসীরা ওই জমিটি দখলে নেওয়ার পাঁয়তারা করছেন। আমাদের জমির ফসলসহ গাছপালা কেটে নষ্ট করায় দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি।’ তবে ২০-২২ বছর আগে জমি কিনলেও ২০১০ সালে দখলে নিতে গেলেন কেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে সাইফুল ইসলাম দাবি করেন, এত দিন জমিটি স্থানীয় কৃষককে বর্গা দেওয়া ছিল।
১৯ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে ঘটনাটি জানতে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলা হয়। এ সময় মরিচা গ্রামের নিরেন চন্দ্র বর্মণ (৪৫) জানান, তিনি বেলওয়া গ্রামে বরেন্দ্র বহুমুখী প্রকল্পের গভীর নলকূপের চালক। আদিবাসীদের জমিটি তাঁর গভীর নলকূপসংলগ্ন। ছোটবেলা থেকে তিনি জমিটি দালেল হাসদা ও স্বরূপ হাসদার পরিবারের লোকজনকে চাষাবাদ করতে দেখে আসছেন। ২০১০ সাল থেকে নুরু মিয়া ও সাইফুল ইসলাম জাল দলিলের মাধ্যমে জমিটি দখলের চেষ্টা করলে তিনি আদিবাসী পরিবারটিকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে আসছেন। এ কারণে নুরু ও সাইফুল ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিটি মামলায় তাঁকে আসামি করে হয়রানি করছেন।
গত ১৬ আগস্ট রাতে নিরেন চন্দ্র ও নলকূপের পাহারাদার রবি হাসদা নলকূপ পাহারা দেওয়ার জন্য চাটাই ও টিনের তৈরি ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। ওই রাতে নুরু ও সাইফুল ইসলাম ঘরে অগুন ধরিয়ে দিয়ে তাঁদের পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেন। এ ঘটনায় ১৮ আগস্ট নিরেন বাদী হয়ে ঘোড়াঘাট থানায় একটি মামলা করেন।
এ ছাড়া বিলপাড়া গ্রামের আজিজুল ইসলাম, বেলওয়া গ্রামের আজিজার রহমান, লাল মিয়া আলতাফ হোসেন, আন্তাজ আলীসহ ১২-১৪ জন অভিযোগ করেন, আদিবাসী পরিবারকে সহযোগিতা করায় নুরু ও সাইফুল ইসলাম তাঁদেরসহ গ্রামের নিরীহ অনেককেই মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন।
এ ব্যাপারে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দুই ব্যক্তিকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টার ঘটনাটি সাজানো। ওই দিন আমি চিকিৎসার জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছিলাম।’
পালশা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান কাজী মাকসুদুর রহমান জানান, বিরোধপূর্ণ জমিটি আদিবাসীদের পৈতৃক। জাল দলিলের মাধ্যমে নুরু ও সাইফুল জমিটি দখলের পাঁয়তারা করছেন। একই অভিযোগ করেন ওই ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান কবিরুল ইসলামও।
ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরহাদ ইমরুল কায়েস জানান, গভীর নলকূপের চালকসহ এক আদিবাসীকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টার অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ওই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েছেন। মামলার আসামিরা জামিনে থাকায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি জানান।