আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে ‘যতদ্রুত’ সম্ভব আগাম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে সরকারকে বাধ্য করা হবে-বিএনপির পক্ষ থেকে যখন অব্যাহতভাবে এরকম কথা বলা হচ্ছে, ঠিক তখনই দলটির সামনে দেখা দিয়েছে কতগুলো বিপরীতমুখী উপসর্গ। মধ্যবর্তী নির্বাচন ও সংলাপের সম্ভাবনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাকচ করে দেয়া, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদী ও জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে শেখ হাসিনার ‘ফলপ্রসূ’ বৈঠক এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনার বক্তব্যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত নতুন করে চিন্তিত করে তুলেছে বিএনপিকে। এর বাইরে দলীয় প্রধান ও তার পরিবারের সদস্যসহ দলের কেন্দ ীয় ও মাঠ নেতাদের ঘাড়ে মামলার বোঝা, ২০ দলীয় জোটে টানাপোড়েন এবং বর্তমান সরকারের আমলে জোটের প্রথম হরতালে নেতা-কর্মীদের মাঠে না নামার ঘটনা বিএনপির ভেতরে চলমান হতাশার গভীরতা আরও বাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মান সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিতে পারে। কারণ বিশ্বের সবাই জানে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে। আর ড্যান মজীনা যেটি বলেছেন তা সম্ভবত তিনি বিদায়ী রাষ্ট্রদূত হিসেবে বন্ধুসুলভ আচরণের খাতিরে বলেছেন। নতুন যিনি রাষ্ট্রদূত হয়ে আসবেন তার বক্তব্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত বার্তা বোঝা যাবে। তারপরেও উপরোক্ত বিষয়গুলোকে হাল্কাভাবে নেয়া কোনো রাজনৈতিক দলের উচিত হবে না।’
রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কোনো কোনো মহলে যখন আগাম কিংবা মধ্যবর্তী নির্বাচনের মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল তখনই স্পষ্টভাষায় বিষয়টিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুক্রবার নিউইয়র্কে সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘রাজনীতিতে কেউ ভুল করলে সেটির খেসারত তাদেরই দিতে হবে। সংসদে এখন বিরোধী দল আছে। যারা বাইরে আছে তারা তো বাইরেই থাকবে।’ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ দলের শীর্ষ নেতারা সংলাপের আয়োজন করতে বারবার সরকারের প্রতি আহ্বান জানালেও নিউইয়র্কের এই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা পাল্টা বিস্ময়ের সুরে বলেছেন, ‘সংলাপ? সংলাপ আবার কী? কার সঙ্গে সংলাপ? দেশে এমন কী পরিস্থিতি হয়েছে যে, সংলাপে বসার প্রয়োজন পড়লো! যারা নির্বাচন বর্জন করেছে তারা ভুল করেছে। এখন সংলাপ করে কী তাদের ক্ষমতায় আনতে হবে?’
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ফলাফল কী হবে তা প্রধানমন্ত্রীর ভালোভাবেই জানা আছে। সে কারণেই তিনি সংলাপ ও নির্বাচনে রাজি হচ্ছেন না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সঠিক হয়েছে, এটা প্রধানমন্ত্রী নিজেও কখনও দাবি করেননি। সে কারণেই তাকে বলব, জনআকাঙ্ক্ষা উপলব্ধি করে বাস্তবতায় ফিরে আসুন।’
বিএনপি ও ২০ দল সূত্রে জানা গেছে, দল ও জোটের ভেতর-বাইরের বহুমুখী আলাপ-আলোচনায় তাদের ধারণা ছিল, ২০১৬ সালের মধ্যে সরকার একাদশ সংসদ নির্বাচন দিতে পারে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে চলমান সমালোচনা থেকে কাটিয়ে উঠতে আগাম নির্বাচনের পথে হাটবে সরকার। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বিপরীতধর্মী বক্তব্যে তাদের সেই ধারণায়ও চিড় ধরেছে। আসলে কবে হবে নির্বাচন, ততদিনে দলের পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়-এই ভাবনায় এখন নতুন করে এক ধরনের অন্ধকার ভর করেছে বিএনপি নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে।
আগাম নির্বাচন দিতে সরকারকে বাধ্য করার জন্য নবউদ্যমে আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিকভাবেও চাপ সৃষ্টি হবে বলেও বিশ্বাস করে বিএনপি নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ। কিন্তু জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে সেরকম কোনো বার্তা মেলেনি বান কি মুনের কথাবার্তায়। বরং জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেয়া শেখ হাসিনার বক্তব্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন মুন।
অন্যদিকে, ভারতের লোকসভার নির্বাচনে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটায় অর্থাত্ সোনিয়া গান্ধীর কংগ্রেসকে হারিয়ে বিজেপির বিশাল জয়ে নরেন্দ মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় হাসি ফুটেছিল বিএনপি ও দলটির সমর্থকদের মুখে। তবে শনিবার নিউইয়র্কে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে মোদীর বক্তব্য শুনে সেই হাসি যেন মিলিয়ে যেতে বসেছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমদু আলী সাংবাদিকদের জানান- ‘বৈঠকে মোদী বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন আর তার কন্যা (শেখ হাসিনা) দেশটিকে রক্ষা করেছেন’। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তিস্তার পানি বণ্টন ও স্থলসীমা চুক্তি বাস্তবায়নেরও আশ্বাস দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। মোদীর বক্তব্যকে তার সরকারেরই অবস্থানের ইঙ্গিত অভিহিত করে কূটনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা বিএনপির জন্য তাত্পর্যপূর্ণ বার্তা।
নরেন্দ মোদীর এই মনোভাব প্রকাশের একদিন পরেই, মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনার বক্তব্যও ভাবিয়ে তুলেছে বিএনপিকে। এদিন ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে মধ্যবর্তী নির্বাচন ও সংলাপকে ‘বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়’ অভিহিত করে মজীনা বলেছেন ‘বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই এর সুরাহা করবে।’
ড্যান মজীনার এই বক্তব্যকে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের বার্তা বলে মনে করছেন অনেকে। তাদের মতে, নির্বাচন নিয়ে ওয়াশিংটন শুরু থেকেই সমালোচনামুখর। এই নির্বাচনকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন’ ও ‘জনগণের অংশগ্রহণমূলক নয়’ অভিহিত করে মার্কিন প্রশাসন বরাবরই সংলাপের মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে আসছিল। সংলাপে বসে মতপার্থক্য দূর করতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ধারাবাহিকভাবে আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন মজীনা নিজেও; কিন্তু তার এবারের বক্তব্যে ওই ধরনের কোনো আহ্বান না থাকায় বিষয়টি বিএনপি শিবিরকে চিন্তায় ফেলেছে। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্য সফরে গেলে তার সঙ্গে বৈঠকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও বলেছিলেন ‘বাংলাদেশের নির্বাচন এখন অতীত, আমরা সামনের দিকে তাকাতে চাই।’
জানা গেছে, জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও যুক্তরাজ্যের মনোভাবকে একসঙ্গে মিলিয়ে এ থেকে বার্তা খোঁজার চেষ্টা করছে বিএনপি। দলটির মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা মনে করছেন, আগাম নির্বাচন দিতে সরকারের ওপর কূটনৈতিক কিংবা আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রেও হোঁচট খাচ্ছে দল। ফলে কূটনৈতিক দিক থেকেও আপাতত কোনো আশার আলো দেখছেন না কর্মী-সমর্থকরা। অবশ্য বিষয়টিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান। ইত্তেফাককে তিনি বলেন- ‘সংলাপ ও নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, এনিয়ে তো আমাদেরও দ্বি-মত নেই। আমাদের দাবি তো কোনো দেশ বা রাষ্ট্রদূতের কাছেও নয়। দাবি সরকারের কাছে, সরকারকেই সংকটের সমাধান করতে হবে।’
কূটনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি দল ও জোটের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ভাবনায় ফেলেছে বিএনপিকে। দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়া, তার দুই সন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ জিয়া পরিবারের কয়েক সদস্য এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাসহ মাঠ নেতা-কর্মীদের প্রায় প্রত্যেকেরই ঘাড়ে ঝুলছে একাধিক মামলা। দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ৪ হাজার ৫৫১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার জনকে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংস আন্দোলনে গাড়ি পোড়ানো, ভাঙচুর ও সম্পদের ক্ষতিসাধনের অভিযোগে দায়েরকৃত এসব মামলার বিচারকাজ তিন মাসের মধ্যে সম্পন্নের পদক্ষেপ নিতে এরইমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাঠিয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে জেলা প্রশাসকদের। এর বাইরে জিয়া চ্যারিটেবল ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে অনিয়মের মামলায় খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভাগ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা।
বিএনপির বিভিন্ন স্তরে কথা বলে জানা গেছে, মামলার ভারে ন্যুব্জ নেতা-কর্মীরা নতুন করে আন্দোলনে মাঠে নামারও সাহস পাচ্ছেন না। যার প্রতিফলন দেখা গেছে বর্তমান সরকারের আমলে ডাকা গত ২২ সেপ্টেম্বরের প্রথম হরতালে। ফলে ঈদের পর আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হবে বলে খালেদা জিয়া সর্বশেষ গত শনিবার জামালপুরের সমাবেশে বললেও তাতে আস্থা পাচ্ছেন না দলের নেতা-কর্মীরা। দলের পাশাপাশি ২০ দলীয় জোটেও দেখা দিয়েছে টানাপোড়েন। জোটের একটি শরিক ও চারটি শরিকের ভগ্নাংশ বেরিয়ে গিয়ে পৃথক জোট গঠন করেছে। জোট শরিকদের এই ছোটাছুটি পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার রাতে জোট নেতাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসছেন খালেদা জিয়া।