শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

হিন্দু সমপ্রদায়ের সবচেয়ে বড় উত্সব শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুক্রবার শেষ হলেও প্রতিমা বিসর্জন হয়েছে গতকাল। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ ও কল্যাণ এবং সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরন্তর শান্তি ও সম্প্রীতির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে শারদীয় উত্সবের দেবী বিসর্জনের দিনটিও ছিল ব্যাপক আনন্দ ও উত্সবমুখর।

গতকাল রাজধানীতে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির যৌথ উদ্যোগে বিজয়া শোভাযাত্রা শেষে বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়। সকাল থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে নামে ভক্তদের ঢল। একদিকে বিদায়ের সুর, অন্যদিকে উত্সবের আমেজ। ঢাকেশ্বরী মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন, তাঁতী বাজার, শাঁখারী বাজার, স্বামীবাগসহ বিভিন্ন মণ্ডপে চলে আবির উত্সব। বিজয়া শোভাযাত্রা ও প্রতিমা নিরঞ্জনে অংশ নিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ থেকে ভক্তরা ট্রাক ও ঠেলাগাড়িতে করে প্রতিমা নিয়ে সমবেত হতে শুরু করেন ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে। শোভাযাত্রার পূর্বে নারীরা দেবীর ললাটের সিঁদুর আপন ললাটে এঁকে নেয়। পুরুষরা কায়মনোবাক্যে অশুভ শক্তির বিনাশ কামনা করেন। তাদের অন্তরের কামনা আগামী শরতে আবার বাঙালি হিন্দুর ঘরে ঘরে ফিরে আসবেন মা ‘উমা’। মন্দির ও শোভাযাত্রার যাত্রাপথে বিপুলসংখ্যক পুলিশের পাশাপাশি  মোতায়েন করা হয়েছিল র্যাব সদস্যদেরও।

চট্টগ্রাম অফিস:হাজারো ভক্তের হূদয় বিষাদে ভরিয়ে দিয়ে ধরাধাম থেকে বিদায় নিয়েছেন দেবী দুর্গা। গতকাল শনিবার প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এবারের পূজার সকল আয়োজন। নগরীর কাট্টলী রাসমনি ঘাট, কর্ণফুলীর অভয় মিত্র ঘাট, মোহরাসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা বিসর্জন হয়। তবে সর্ববৃহত্ আয়োজন ছিল পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে পুরো সৈকত এলাকা পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীর মিলনমেলায় পরিণত হয়। পতেঙ্গার কাটগড় এলাকা থেকে সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত পুরো এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করে পুলিশ। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে প্যান্ডেল ও মঞ্চ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, পানীয় জল ও মেডিক্যাল টিমের ব্যবস্থা করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।

নগরীর অধিকাংশ মণ্ডপের প্রতিমাই পতেঙ্গা সৈকতে বিসর্জন দেয়া হয়। বেলা ১২টার পর ট্রাকে করে বিভিন্ন এলাকার প্রতিমা সৈকতে আনা শুরু হয়। এরপর ঢাকের বাজনা, শঙ্খ ও উলুধনির মধ্য দিয়ে একের পর এক প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। এসময় পুণ্যার্থীরা দেবী দুর্গার জয়ধ্বনি দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

বিকালে সমুদ্র সৈকতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে নগরীর তিনটি শ্রেষ্ঠ পূজা মণ্ডপকে পুরস্কৃত করা হয়। লালখান বাজারের সনাতন সমাজ কল্যাণ সংঘ প্রথম, হাজারী লেন পূজা উদযাপন পরিষদ দ্বিতীয় এবং দক্ষিণ নালাপাড়া পূজা উদযাপন পরিষদ তৃতীয় স্থান অধিকার করে। সিটি মেয়র মো. মনজুর আলম সেরা মণ্ডপের প্রতিনিধিদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

কক্সবাজার প্রতিনিধি: বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে গতকাল শনিবার বিকালে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রতিমা বিসর্জনদান উপলক্ষে লাখো মানুষের মিলনমেলা ঘটে। এটি দেশের সর্ববৃহত্ দুর্গা বিসর্জনদান অনুষ্ঠান বলে দাবি করেন আয়োজকরা।

জানা যায়, ৫ দিনব্যাপী দুর্গোত্সবের শেষ দিনে গতকাল শনিবার বিকালে কক্সবাজারের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শোভাযাত্রা সহকারে প্রতিমা বিসর্জন দেন। এতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরাও যোগ দেন। প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে শনিবার বেলা তিনটা থেকে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে হিন্দু সমপ্রদায়ের নারী-পুরুষের সমাগম শুরু হয়। বিকাল পাঁচটার আগেই লক্ষাধিক মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় সৈকত। বিসর্জনের আগ পর্যন্ত সৈকতের বালুচরে রাখা ‘মা দুর্গা’র প্রতিমা ঘিরে ধরে চলে ভক্তদের শেষ আরাধনা। বিকাল সোয়া পাঁচটায় মন্ত্রপাঠের পর মাইকে ঘোষণা দেয়ার পরপরই অশ্রুজলে প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়। অনুষ্ঠানে কক্সবাজার শহরসহ সদর, উখিয়া, রামু, চকরিয়া, টেকনাফসহ বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে সৈকতে নেয়া ২ শতাধিক প্রতিমা একে একে বিসর্জন দেয়া হয় বঙ্গোপসাগরের জলে।

কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাবুল শর্মা জানান, এ বছর জেলায় ২৫৮টি মণ্ডপে পূজা উদযাপিত হয়। এর মধ্যে ২ শতাধিক প্রতিমা কক্সবাজার সৈকতে বিসর্জন দেয়া হয়েছে।

বেলা চারটায় সৈকতের লাবণী পয়েন্টে বিজয়া মঞ্চ থেকে শুরু হয় বিসর্জনের অনুষ্ঠান। কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রণজিত্ দাশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি খোরশেদ আরা হক, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিন, কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র সরওয়ার কামাল, পুলিশ সুপার শ্যামল কান্তি নাথ, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি একে আহমদ হোসেনসহ অন্যরা। সভা পরিচালনা করেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাবুল শর্মা।

প্রতীমা বিসর্জন নিরাপদ করতে জেলা পুলিশ বেলা দুইটার পর থেকে সৈকতে নামার প্রধান সড়কে যানবাহন ও রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেয়।