শেষ পর্যন্ত সেখানে গরুর হাট বসলোই। ইজারাদার ও তাদের নেপথ্যে ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতার কাছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় নির্দেশনা গুরুত্ব পায়নি। নির্দেশনার মূল্যায়ন হয়নি। মূল্যায়ন হয়েছে অর্থলিপ্সু কতিপয় দলীয় নেতার। তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আগারগাঁও নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের সামনে গরুর হাট বসানোর কারণে সেখানে অপারেশনসহ সকল ধরনের চিকিত্সা সেবা বন্ধ। আসা-যাওয়ার সকল রাস্তা বন্ধ থাকায় রোগীরাও আসতে পারছেন না। চিকিত্সক-নার্সসহ কর্মচারী ইনস্টিটিউটে প্রবেশ করতে পারছেন না। ইনস্টিটিউটের প্রবেশ পথে প্রধান সড়কে গরুর হাট বসানোর কারণেই এই অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের পরিচালকসহ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেছেন, দেশে ব্রেন স্ট্রোক, মাথায় আঘাত, টিউমারসহ নিউরোলজী ও নিউরো সার্জারী চিকিত্সা সেবার জন্য একমাত্র পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা কেন্দ্র এই ইনস্টিটিউট। এখানে গরুর হাট বসালে শত শত রোগী মৃত্যু ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। সে জন্য তিনি সেখানে গরুর হাট না বসানোর জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সিটি কর্পোরেশন (উত্তর) কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ইজারাদার ও অর্থলোভী কতিপয় নেতার কাছে শত শত রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকির বিষয়টি কোন গুরুত্বই পেলো না। উল্টো ক্ষিপ্ত হয়ে গরুর হাটের ইজারাদার বাহিনী নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের সামনে এমনভাবে ব্যারিকেড দিয়ে গরুর হাট বসিয়েছে যে, কোন ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারী সেখানে প্রবেশ করার সুযোগ পাবেন না। গতকাল শনিবার ইনস্টিটিউট পরিচালকসহ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা সেখানে প্রবেশ করতে পারেননি। কোন কোন চিকিত্সক বিবেকের তাড়নায় বাউন্ডারি পেড়িয়ে ইনস্টিটিউটে প্রবেশ করেছেন। আর ভিতরে গিয়ে সঙ্কটাপন্ন রোগীদের করুণ অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন নিউরোলজিস্ট ইনস্টিটিউটের যুগ্ম-পরিচালক প্রখ্যাত অধ্যাপক ডাঃ বদরুল আলম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, তিনজন রোগী মারা গেছেন। তাদের লাশ বের করার মত সুযোগ পাননি স্বজনরা। তাদের আহাজারিতে ঐসময় মনে হচ্ছিল কেন চিকিত্সক হলাম? আর কতো এই চরম নিষ্ঠুর, নির্দয় দৃশ্য দেখতে হবে? এটা তো স্বাধীন দেশের নাগরিকদের কাম্য নয়।
একজন পুলিশ সার্জেন্টের পিতার জরুরি অপারেশন করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ডা: বদরুলের কাছে এসে পুলিশ সার্জেন্ট বলেন, স্যার দয়া করে আমার বাবার অপারেশন করুন, নইলে তিনি মারা যাবেন। ডাঃ বদরুল তখন ঐ পুলিশ সার্জেন্টকে বলেন, আপনি কয়েকজন সার্জনকে (যারা অপারেশন করবেন) ইনস্টিটিউটে আনার ব্যবস্থা করুন। কিন্তু ঐ পুলিশ সার্জেন্টও সার্জনদের গরু হাটের ব্যারিকেড পার করে আনতে ব্যর্থ হন। অবশেষে পুলিশ সার্জেন্ট এসে বলেন, “স্যার, আমি ব্যর্থ গরুর হাটের কাছে। আমার বাবার জীবনের কোন মূল্য নেই স্যার, গরুরহাট ইজারাদারের মূল্য বেশি। আমি হেরে গেলাম স্যার”- একথা বলে পুলিশ সার্জেন্ট কাঁদতে কাঁদতে অধ্যাপক ডাঃ বদরুলের কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। পুলিশ সার্জেন্টের পিতাকে অবশেষে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে রাখা হয়। তার ভাগ্যে কি ঘটবে বলা মুশকিল।
ডাঃ বদরুল আলম বলেন, সংকটাপন্ন রোগীদের সময়মত চিকিত্সা দিতে না পারায় তাদের যে কি পরিণতি হয় তা একজন চিকিত্সক হয়ে মেনে নিতে পারছি না।
ইনস্টিটিউটে চিকিত্সাধীন রোগী মাগুরার কবির হোসেন (৫৫), সিরাজগঞ্জের আবদুর রাজ্জাক (৬০) ও মাদারীপুরের মজিবুর রহমান (৭০) মারা যান। গতকাল তাদের লাশ ইনস্টিটিউট থেকে বের করতে স্বজনরা ইজারাদার ও তাদের বাহিনীর কাছে বহু আবেদন নিবেদন করেন। কিন্তু লাশ নেয়ার জন্য হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করতে দেয়নি তারা। পঙ্গু হাসপাতালের সামনে সড়ক থেকে নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট হয়ে পরিবেশ অধিদফতরের সামনের পুরো সড়ক জুড়েই গরুর হাট। রোগী আনা নেয়ার মত কোন পথ নেই। দীর্ঘ সময় চেষ্টার পর স্বজনরা কোন রকমে লাশ পার করে নিয়ে যান। ঐ দৃশ্য দেখে চিকিত্সক, নার্স ও কর্মচারিরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
আগারগাঁও নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট তিনশত বেডের একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। সারাদেশ থেকে প্রতিদিন সহস াধিক সংকটাপন্ন ও মরণাপন্ন কিংবা জটিল নিউরো সার্জারির রোগীরা চিকিত্সার জন্য সেখানে আসেন। কিন্তু ইনস্টিটিউটের সামনে গরুরহাট বসানোর পর থেকে রোগী আসা বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল থেকে সেখানে পুরো চিকিত্সা সেবাই বন্ধ। ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ বলেন, প্রতি সিফটে ৪০ থেকে ৫০ জন নার্সের ডিউটি থাকে। শুধু চিকিত্সক থাকলেই চলবে না, নার্স ও কর্মচারি না থাকলে রোগীদের চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হবেই। তিন শিফটে কোন নার্সই গতকাল থেকে ইনস্টিটিউটে আসতে পারেননি বলে কর্তৃপক্ষ জানান।
উল্লেখ্য, গত বছর অনুরূপভাবে নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউটের সামনে গরুরহাট বসিয়ে রোগীদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। বেশ কয়েকজন রোগী সময়মত সুচিকিত্সা না পেয়ে মারা যান। ঐ ঘটনার পর সিটি কর্পোরেশনের (উত্তর) নির্বাহী প্রধান এনামুল হক সরেজমিনে গিয়ে দেখেছেন ইনস্টিটিউটে রোগীদের চিকিত্সা সেবার করুণ অবস্থা। ইনস্টিটিউট পরিচালক প্রখ্যাত নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডাঃ কাজী দীন মোহাম্মদ ও যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ বদরুল আলমের কাছে ঐসময় সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রধান ওয়াদা করেন যে, এখানে আর গরুরহাট বসবে না। সেই কথাও তিনি এবার রাখেননি।
উল্টো এই কর্মকর্তা ইনস্টিটিউটের কর্তৃপক্ষকে বলেন, কয়েকদিনের গরুর হাটে কি আর ক্ষতি হবে? রোগীদের জীবনের মূল্যের চেয়েও গরুর হাটের মূল্য কী বেশি?- এমন প্রশ্ন করলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
রাজধানীতে এটি ছাড়া আর ১৮টি গরুর হাট রয়েছে। এই হাট না থাকলে নগরবাসির কিছুই আসে যায় না। - এমন মন্তব্য করে গত সপ্তাহে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে গরুরহাট বন্ধ করার জন্য উক্ত সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রধানকে জানানো হয়। অভিযোগ উঠেছে, এক শীর্ষ নেতার বদৌলতে তিনি সিটি কর্পোরেশন (উত্তর) নির্বাহী প্রধান হয়েছেন। উক্ত গরুরহাট বসানোর পিছনে ঐ নেতার সুপারিশ রয়েছে। একারণে দুই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা না মেনে তিনি নেতার নির্দেশনা মেনেছেন। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এসব বিষয়ে জানতে গতকাল সিটি কর্পোরেশন (উত্তর) এনামুল হকের সঙ্গে দুই দফা ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, এ গরুর হাটের কারণে পঙ্গু হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, কিডনি ও মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট, জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালেও চিকিত্সা ব্যাহত হচ্ছে।