হাটের হই-হল্লা, কোরবানির জন্য পছন্দের পশু নিয়ে দর কষাকষি, এক পর্যায়ে পশু ক্রয় এবং তা নিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে বাড়ি ফেরা — ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে ফিরে এসেছে সেই আনন্দময় দিনগুলো।
দীর্ঘ পথ হাঁটার আনন্দও কিন্তু কম নয়, অনভ্যস্ত হাতে গরু সামলানো আর পথ চলতি মানুষকে সেই গরুর দাম বলতে বলতে বাড়ি ফেরা। এও যেন কোরবানির ঈদের এক আনন্দময় অনুষঙ্গ। রাজধানীবাসীর সমস্ত আগ্রহ এখন কোরবানির হাটগুলোকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত।
ষাটোর্ধ্ব ওয়ালি উল্লাহ এসেছিলেন আফতাবনগর গরুর হাটে। তাকে গরুর দাম জিজ্ঞেস করতেই হাসিমুখে উত্তর দিলেন, যে দাম দিয়েই কিনুন না কেন, কোরবানি হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে বান্দার উত্সর্গ। সুতরাং দামটা বড় নয়, পশু পছন্দ করে কিনে কোরবানি দেয়াই বড় কথা। কেনায় হার-জিত, মাংস বেশি হবে নাকি কম, এটা বিবেচ্য বিষয় নয়।
ঈদুল আযহার একদিন বাকি থাকতে রাজধানীর হাটগুলো গবাদি পশুতে উপচে পড়েছে। হাটের নির্ধারিত স্থান ছাড়িয়ে তা ছড়িয়ে পড়েছে আশ-পাশের এলাকাগুলোতেও। স্থান সংকুলান না হওয়ায় প্রায় সবগুলো হাটে নির্দিষ্ট জায়গা পেরিয়ে আশ-পাশের জায়গাতে রাখতে বাধ্য হয়েছে গরু, মহিষ ও ছাগল। গাবতলীসহ আরও কয়েকটি হাটে উট এবং দুম্বাও ক্রেতাদের আকর্ষণের কেন্দ্রে ক্রেতাদের আকর্ষণের জন্য বিক্রেতারা সাজিয়েছেন বাহারি সাজে। গরুর শিং ও কুঁজে দেয়া হয়েছে রঙিন মালা। গলায় রঙিন কাগজের মালা। কোনো কোনো গরুর রয়েছে বাহারি নাম। মি. ডলফিন, কালা পাহাড় এবং বিগ এলিফেন্টসহ আরও কত কি।
শুক্রবার যারা গরুর দাম কম হবে কি-না এ নিয়ে দোদুল্যমানতায় ছিলেন, গতকাল সেই দোদুল্যমানতা কেটে গেছে। দেদারছে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশু। পশুর দামও চলে এসেছিল প্রত্যাশার কাছাকাছি। কোরবানির হাটগুলোতে আমদানি প্রচুর। গতকাল শনিবার গভীর রাত পর্যন্ত গরুর ট্রাক আসতে দেখা যায় রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে। ফলে দুপুরের পর থেকেই পশুর দাম কমতে দেখা গেছে।
ভারতীয় গরুর জাত হরিয়ানা ও মুলতানি প্রায় হাতি আকৃতির গরুও লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ধনী ব্যক্তিরাই ছিলেন এসব গরুর ক্রেতা। তবে মধ্যবিত্তদের মূল আগ্রহ ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট গরুর প্রতি।
কুষ্টিয়ার গরু ব্যবসায়ী হানিফ শেখ বললেন, গত বছর গরু আটকে রেখেছিলাম যে, শেষ সময়ে বিক্রি হয়ে যাবে ভেবে কিন্তু এত সরবরাহ ছিল যে, শেষে লসে বিক্রি করতে হয়েছিল। সে কারণে এবার আর ঝুঁকি নেইনি। গরু বেশি এনেছি, অল্প লাভে বিক্রি শুরু করেছি। তিনি জানালেন, ৬৫টি গরু এনেছিলেন শনিবার দুপুরের মধ্যেই ৫০টি বিক্রি শেষ করেছেন।
গতকাল ছোট গরু বিক্রি হয়েছে ২০ থেকে ৩০-৩৫ হাজার টাকায়। মাঝারি আকারের গরু বিক্রি হয়েছে ৩৫ থেকে ৬৫-৭০ হাজার টাকায়। ছোট ছাগল ৪ থেকে ৮-৯ হাজারে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি বড় সাইজের ছাগল ৩০-৪০ হাজারেও বিক্রি হতে দেখা গেছে। আর বড় সাইজের গরু ২ থেকে ৫ লাখ পর্যন্ত দামে কেনা-বেচা চলেছে গতকাল রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে।
গতকাল শনিবার ছিল শেষ কর্মদিবস। ফলে অফিস শেষ করে অনেকেই কোরবানির হাটে এসেছেন রাতে। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা গভীর রাত পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে কিনেছেন পছন্দের কোরবানির পশু। সময় যত গড়িয়েছে ততই জমজমাট হয়ে উঠেছে রাতের হাট।
দুই ভাইকে নিয়ে গাবতলীর হাটে কোরবানির পশু কিনতে ব্যাংকের কর্মকর্তা তামজিদুল জনি। তিনি বললেন, অফিস শেষ করে এসেছি। কোনো তাড়া নেই নিশ্চিন্ত মনে দেখে-শুনে কোরবানির পশু কিনবো। তিনি বললেন, দাম কম হোক বা বেশি কোরবানি দেয়াটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সেটা পালন করাটাই বড় কথা।
কথা হয়, নিলুফার জান্নাতের সঙ্গে। ১২ বছরের ছেলে তৌসিফকে নিয়ে এসেছেন গাবতলী পশুর হাটে। তিনি বললেন, আমার স্বামী প্রবাসে থাকেন। তিনি টাকা পাঠিয়েছেন কোরবানির। গত দুই বছর ধরে আমিই পছন্দ করে কোরবানির পশু কিনি। ছোটবেলায় মেয়ে বলে বাবা কখনো নিয়ে আসতো না। কিন্তু কোরবানির পশুর হাটে ঘুরে ঘুরে কোরবানির পশু কিনতে তার ভাল লাগছে বলে জানালেন তিনি। বললেন, পরিবেশ ভালো মেয়ে বলে কেউ বিরক্ত করছে না, অশালীন আচরণও করেনি।