ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন আর নেই

মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে শেষ পর্যন্ত বয়সের কাছে হার মানলেন ভাষা সংগ্রামের অকুতোভয় যোদ্ধা আব্দুল মতিন। মৃত্যু ছাড়া এর আগে আর কারোর কাছেই হার মানেননি তিনি। তার জীবন যেন এক নিরন্তর ছুটে চলা এক যোদ্ধার জীবন। ভাষা আন্দোলনে তার অসামান্য অবদানের জন্য জাতির কাছে তিনি ‘ভাষা মতিন’ হিসাবে পরিচিত।
 বুধবার সকাল ৯টায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৮৮ বছর। মৃত্যুকালে তিনি তিনি স্ত্রী গুলবদন নেসা, দুই মেয়ে মতিয়া বানু শুকু ও মালিহা শুভসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদসহ মন্ত্রীপরিষদ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ও সংগঠন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল মজিদ ভূইয়া জানান, মস্তিস্কে রক্তক্ষরণে সঙ্কটাপন্ন আবদুল মতিনকে গত ১৯ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার অবস্থার অবনতি হলে গত ৩ অক্টোবর থেকে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।
ভাষা মতিনের স্ত্রী গুলবদন নেসা জানান, ‘তিনি গত ৩ অক্টোবর থেকে কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছিলেন। সে অবস্থায় বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় চিকিত্সকরা তার লাইফ সাপোর্ট খুলে নেন।’ তিনি জানান, আবদুল মতিন তার চোখের কর্নিয়া সন্ধানীকে ও দেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য দান করে গেছেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আবদুল মতিনের মরদেহ রাখা হয়েছে বিএসএমএমইউয়ের হিমাগারে। এর আগে আইসিইউতে তার চোখের কর্নিয়া সংগ্রহ করে সন্ধানী।’
এদিকে, বুধবার দুপুরে বিএসএমএমইউয়ের পরিচালকের কক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। সেখানে বিএসএমএমইউয়ের তত্ত্বাবধায়নে ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহযোগিতায় তার নাগরিক শ্রদ্ধানুষ্ঠান হবে। এরপর তার মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হস্তান্তর করা হবে। এতে উপস্থিত ছিলেন বিএসএমএমইউয়ের উপাচার্য ড. প্রাণ গোপাল দত্ত, পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল মজিদ ভূঁইয়া, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়, আবদুল মতিনের নাগরিক শোকসভার জন্য শুক্রবার বিকেল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির ক্যাফেটরিয়ায় জাতীয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে, আবদুল মতিনকে শেষবারের দেখতে হাসপাতালে ছুটে আসেন বিশিষ্টজনেরা। এদের মধ্যে ছিলেন ব্যারিষ্টার আমীর-উল-ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ, সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, অধ্যপক আবদুল মান্নান চৌধুরী, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, গণসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীর, জাসদ নেত্রী শিরিন আখতার, নারীনেত্রী ফরিদা আখতার, মোশেরফা মিশুসহ আরও অনেকে।
বাঙালির হাজার বছরের গৌরবময় ভাষা আন্দোলনের অন্যতম রূপকার ও সংগ্রামী পুরুষ আবদুল মতিনের জন্ম ১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলার ধুবলিয়া গ্রামে।
তিনি দার্জিলিং গভর্নমেন্ট হাইস্কুল থেকে ১৯৪৩ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় এবং ১৯৪৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৪৭ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রথম ব্যাচে ভর্তি হন। এ সময় তিনি ভর্তি হন আইন অনুষদেও।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে সরকার পোস্টাল স্ট্যাম্প, পোস্ট কার্ড, মনিঅর্ডার ফরম এবং খামে বাংলার পরিবর্তে উর্দুভাষা ব্যবহার করতে শুরু করলে নিম্ন আয়ের সরকারি চাকরিজীবীরা এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। আবদুল মতিন তাদের দ্বারা ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হন। বাংলাভাষার প্রতি শাসকগোষ্ঠীর অবজ্ঞার প্রতিক্রিয়া দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের ভাষা দিবসে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলা হয়।
১৯৪৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার সময় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে দুই মাসের আটকাদেশ দেয়। জেলে থাকা অবস্থায় তাকে জানানো হয়, তিনি সিএসপি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু চাকরির শর্ত তার কাছে অসম্মানজনক মনে হওয়ায় তিনি সে সার্ভিসে যোগ দেননি। আটকাদেশের মেয়াদ শেষ হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন ভিসি ড. মোয়াজ্জেম হোসেন তাকে আন্দোলন করবেন না এই মর্মে মুচলেকায় সই করতে বললে তিনি তা করতে অস্বীকার করেন এবং এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে তিন বছরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবদুল মতিনের প্রতি যথার্থ সম্মান দেখিয়ে পরে ওই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে।
ভিত্তিতে ১৯৫০ সালের ১১ মাচের্র এক জনসভায় আব্দুল মতিনের কণ্ঠে বেজে উঠেছিল সেই বাণী যা বঞ্চিত এই জাতির বহু কাঙ্খিত বহু প্রতীক্ষিত। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের এখন মাতৃভাষার রক্ষার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। আর এই কাজটা ছাত্ররাই করতে পারে। প্রথমে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষাকামী ছাত্রসংগঠনগুলিকে নিয়ে একটি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করতে হবে। এই সংগ্রাম কমিটি  দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুরূপ সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলবে। ছাত্রদের সংগঠিত শক্তির মাধ্যমে আন্দোলনকে এমনভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে যাতে জনগণ ধাপে ধাপে সামিল হতে পারে। এইভাবে ছাত্র ও জনগণের শক্তিতে আন্দোলন এমন দুর্বার হয় উঠবে যে শাসকরা মাথা নত করতে বাধ্য হবে।’
১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ভাষা দিবসের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ছাত্রদের একটি সভায় আন্দোলন পরিচালনার জন্য ‘সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম কমিটি’ নামে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হলে তিনি এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন।
১৯৫২ সাল পর্যন্ত সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বস্তরে আন্দোলন ফলপ্রসূ করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীনের উর্দুপ্রীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন তিনি এবং ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি গঠিত ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি দেশব্যাপী ২১ ফেব্রুয়ারি তীব্র আন্দোলনের ডাক দেন।
 সরকার ওইদিন ১৪৪ ধারা জারি করে। আবদুল মতিনসহ অন্যরা ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং তারই নেতৃত্বে ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারা বাংলার জন্য আন্দোলনের যেসব কর্মসূচি গৃহীত হয়, এর অংশ হিসেবে ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হয়। এর পরের ইতিহাস বাঙালির অস্তিত্ব, বাংলাভাষার মর্যাদা রক্ষার ইতিহাস। এই আন্দোলনে যারা শহীদ হন, সব ধরনের ঝুঁকির মধ্যেও ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি তার সঙ্গীদের নিয়ে তাদের গায়েবানা জানাজার ব্যবস্থা করেন।
২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্রদের নিয়ে প্রথম ভাষা শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে রাত জেগে ছাত্ররা তৈরি করেন শহীদ মিনার। ১৯৫২ সালের ৭ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার একটি গোপন বৈঠক থেকে অন্য ভাষা সংগ্রামীদের সঙ্গে তাকেও গ্রেফতার করা হয় এবং পরের বছর ১৪ মার্চ তাদের মুক্তি দেয়া হয়।
তিনি ১৯৫৩ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে’র সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে তিনি পাবনা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক নিযুক্ত হন। মওলানা ভাসানী ‘ন্যাপ’ গঠন করলে তিনি ১৯৫৭ সালে তাতে যোগ দেন।
ভাষা সৈনিক হিসেবে সর্বজন শ্রদ্ধেয় আবদুল মতিন বহু গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে— ইউরোপের দেশে দেশে’, ‘কাস্তে’, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি’, ‘প্রবাসীর দৃষ্টিতে বাংলাদেশ’, ‘শেখ হাসিনা: একটি রাজনৈতিক আলেখ্য’, আত্মজীবনী ‘স্মৃতিচারণ পাঁচ অধ্যায়’, ‘জীবনস্মৃতি: একটি বিশেষ অধ্যায়’, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব: কয়েকটি প্রাসঙ্গিক বিষয়’ ‘বাঙালী জাতির উত্স সন্ধান ও ভাষা আন্দোলন’, ‘ভাষা আন্দোলন কি এবং কেন’ এবং ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’। এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে তার আত্মজীবনীমূলক বই ‘জীবন পথের বাঁকে বাঁকে’ইত্যাদি। ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য তাকে ২০০১ সালে ‘একুশে পদক’ দেওয়া হয়। এছাড়াও তিনি বহু পুরস্কার, সম্মননা পেয়েছিলেন।