সাতক্ষীরা ও বর্ধমানে জেহাদি নেটওয়ার্ক!

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান ও বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় জঙ্গিদের আস্তানার সন্ধানে নেমেছে দুই দেশের গোয়েন্দা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। পারস্পরিক সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে জঙ্গিদের মূলোত্পাটনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। গত ২ অক্টোবর বর্ধমানের একটি বাড়িতে শক্তিশালী বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে দুই জন নিহত ও কয়েকজন আহত হবার পর এ তত্পরতা শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, যে কোন উপায়েই হোক সরকার জঙ্গিদের শিকড় উপড়ে ফেলবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী সে জন্য তত্পর রয়েছে।

সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরা ও পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে বেশ কয়েকটি জঙ্গি আস্তানা রয়েছে বলে গোয়েন্দাদের ধারণা। জঙ্গি প্রশিক্ষণ, বোমা ও গ্রেনেড তৈরিসহ নানা কর্মকাণ্ডের পেছনে বড় ধরনের অর্থ যোগান দেয়া হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই থেকে এই অঞ্চলে জেহাদি নেটওয়ার্কের জন্য অর্থ আসছে বলে গতকাল বৃহস্পতিবার কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে। পত্রিকাটির মতে, বর্ধমানের খাগড়াগড়ের বাড়িতে হওয়া বোমা বিস্ফোরণ জঙ্গি জেহাদি নেটওয়ার্কেরই অংশ। দুবাই থেকে এই নেটওয়ার্কে অর্থ আসতো।

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এই নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা ভারতের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছি। বর্ধমান বিস্ফোরণের সঙ্গে জড়িত ও হতাহতদের নাম পরিচয় জানার পর সবকিছু পরিষ্কার হবে। তবে আমাদের গোয়েন্দারাও তদন্ত চালাচ্ছে। পাশাপাশি কড়া নজরদারিও চলছে।’

আনন্দবাজার পত্রিকা ভারতীয় তদন্তকারীদের বরাত দিয়ে বলেছে, বর্ধমানের খাগড়াগড়ের হাসান চৌধুরীর বাড়ির দোতলায় যেসব পুরুষ ও মহিলা আইইডি (ইম্প্রোভাইজ্ড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বানাতো, তাদের জন্য নিয়মিত মাসোহারার বন্দোবস্ত ছিল। সেই টাকা বাংলাদেশি কিছু ব্যবসায়ীর মাধ্যমে দুবাই থেকে বাংলাদেশ হয়ে বর্ধমানে পৌঁছতো। গোয়েন্দাদের ধারণা, আইইডি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, রাসায়নিক ও অন্য সরঞ্জাম কেনার অর্থও বিদেশ থেকে এসেছে।
আবার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা আইবি সূত্রের খবর, শুধু বাংলাদেশ নয়, আসাম রাজ্য থেকেও নিয়মিত লোকজন আসতো খাগড়াগড়ে। মূলত কোকরাঝোড়, বরপেটা থেকে লোক এসে প্রশিক্ষণ দিতো।

জঙ্গিদের সম্ভাব্য আস্তানা হিসেবে এখন গোয়েন্দা-নজরে রয়েছে বর্ধমান শহরের আরও কিছু এলাকা। তদন্তকারীদের অনুমান, এই জঙ্গি নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানতে প্রধান অভিযুক্ত পলাতক কওসরকে খোঁজা হচ্ছে।

তবে দু’দিনের তদন্তে বিস্ফোরণস্থল থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে জেহাদিদের আরও দু’টি আস্তানার হদিস মিলেছে। যার মধ্যে বর্ধমান জেলা সদরের বাবুরবাগের একটি ভাড়াবাড়িও রয়েছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, কওসর ওখানেই থাকতো।

কওসরের ঘনিষ্ঠ বীরভূমের দুই বাসিন্দা কাদের এবং মহম্মদ আলির নামও জানতে পেরেছে সিআইডি। এও জানা গিয়েছে, খাগড়াগড় বিস্ফোরণস্থল থেকে যে মোটরবাইকটি পাওয়া গেছে সেটির রেজিস্ট্রেশন করানো হয়েছে নদিয়া জেলায়। ওই বাইক চালিয়ে বীরভূমের কীর্ণাহারে যাতায়াত করতো কাদের। পাশাপাশি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হাসনাবাদ থেকে ফারুক সর্দার ও সাদ্দাম সর্দার নামে বাংলাদেশের নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবির দুই সদস্যকে  আটক করেছে পুলিশ। তাদের এক নারী সঙ্গীরও খোঁজ চলছে। সাতক্ষীরা জেলার পাঁচপোতা গ্রামের বাসিন্দা ওই দুই যুবকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক নাশকতামূলক কাজকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। তারা মাস আটেক আগে পালিয়ে সেখানে যায়। তাদের কাছ থেকে ছয় হাজার ভারতীয় জাল টাকা পাওয়া গেছে। এই দু’জনের সঙ্গে বর্ধমান বিস্ফোরণের যোগ আছে কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে সিআইডি জানতে পেরেছে, প্রথমে নিজেকে নিরীহ বলে দাবি করলেও খাগড়াগড় বিস্ফোরণে জখম আব্দুল হাকিম একজন বিস্ফোরক ও বোমা বিশেষজ্ঞ। মুর্শিদাবাদের লালগোলার মোকামনগরের একটি মাদ্রাসায় গিয়ে বেশ কয়েকবার জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়েছিল আব্দুল। সন্দেহভাজন কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ করতো সে। তার স্ত্রী আলিমা বিবিও জেএমবি-র সদস্য। এদিন বীরভূমের মহম্মদবাজারের দেউচা গ্রামে, আব্দুল হাকিমের বাড়িতে সিআইডি-র একটি দল যায়। এদিন বিকালে খাগড়াগড় থেকে আটক আলিমা ও রাজিয়া বিবিকে ভবানী ভবনে আনা হয়। আলিমার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরেই বাবুরবাগের ডেরা সম্পর্কে জানতে পেরেছে পুলিশ।

মঙ্গলবার রাতে স্থানীয় আরেকটি বাড়ির তালা ভেঙে উদ্ধার করা হয় দু’টি নাইন এমএম পিস্তল ও ২৩টি কার্তুজ, দু’টি ৭.৬৩ পিস্তল ও ৩৯টি কার্তুজ, জঙ্গি সংগঠনের কিছু চিঠিপত্র, কওসরের নাম লেখা একটি ডাক্তারি প্রেসক্রিপশন ও সিটি স্ক্যানের ছবি, প্রায় সত্তর কেজি বিস্ফোরক তৈরির উপাদান, যার মধ্যে রয়েছে পটাশিয়াম নাইট্রেট, সালফিউরিক অ্যাসিড, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটসহ বেশ কিছু রাসায়নিক।

বাবুরবাগ এলাকার বাসিন্দারা জানান, ব্যাগ হাতে সন্ধ্যা ৬টার পরে কোনদিন নীল-কালো, কোনদিন লাল রঙের মোটরবাইকে চড়ে বাড়িটির দ্বিতীয় তলার ভাড়াটে ওই যুবকেরা আসতো। তাদের মুখ ঢাকা থাকতো হেলমেটে। প্রতিবেশী সালেমা বিবি বলেন, “ওদের দরজা-জানালা সব সময় বন্ধ থাকতো। নীচের তলার ছাত্রদের জামাকাপড় শুকাতে ছাদে যেতে  দিতো না ওরা। তা নিয়ে তর্কাতর্কিও হয়েছে।” খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণের দিন দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ দরজা-জানালা খোলা রেখেই বেরিয়ে গিয়েছিল ওই চার জন।