আওয়ামী লীগ থেকে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে বহিষ্কার করা হচ্ছে আগামী রবিবার। ওই দিন সন্ধ্যায় গণভবনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাকে বহিষ্কার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঈদের আগে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে পবিত্র হজ্ব, হজ্বযাত্রী ও তাবলিগ জামাত নিয়ে চরম আপত্তিকর মন্তব্য করায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হজ্বব্রত পালন শেষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা দেশে ফিরে আসলে মন্ত্রিসভা থেকে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে অব্যাহতি দেয়া হবে। এক্ষেত্রে লতিফ সিদ্দিকীর অব্যাহতির প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। তাকে অব্যাহতির জন্য যাবতীয় ফাইলপত্র ইতিমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি দেশে ফিরে তাতে স্বাক্ষর করলেই অব্যাহতির বিষয়টি কার্যকর হবে।
এদিকে সরকার ও দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর জনরোষে পড়ার ভয়ে লতিফ সিদ্দিকী দেশে আর ফিরে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে তার পারিবারিক একটি সূত্র জানিয়েছে। ঈদের আগে গত ২ অক্টোবর নিউইয়র্ক-ঢাকা তার এয়ারটিকিট রি-কনফার্ম থাকলেও এখনো তিনি দেশে ফিরে আসেননি। মেক্সিকোর হোটেলে দু’রাত কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস হয়ে ফের নিউইয়র্কে এসে সস্ত্রীক দিনাতিপাত করছেন তিনি। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে কানাডার টরেন্টোতে বসবাসকারী তার বোন ও মেয়ের বাসায় স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি ওই দেশের সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে পারেন। এছাড়া তিনি পাশ্চাত্যের সুবিধাজনক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে সমপ্রতি বেরিয়ে এসেছে লতিফ সিদ্দিকীর কয়েকশ’ কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়ম। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে লতিফ সিদ্দিকীর একান্তই ব্যক্তিগত মন্তব্যকে ইস্যু করে রাজনীতির মাঠ গরম করার চেষ্টা করছে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় রাজনৈতিক দল। ইতিমধ্যে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে সারাদেশে একাধিক মামলা হয়েছে। কয়েকটি মামলার সমনও জারি হয়েছে।
টরন্টোতে বসবাসরত লতিফ সিদ্দিকীর ছোট বোন সেলিনা সিদ্দিকী শুশু বলেছেন, লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। ষড়যন্ত্রকারীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে তাকে দূরে সরিয়ে রাখার অপচেষ্টা করছে। যেভাবে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে তাজউদ্দীন আহমদকে সরানো হয়েছে, সে ভাবেই তারা এগুচ্ছে।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা ইত্তেফাককে জানান, ঔদ্ধত্যপূর্ণ, বিতর্কিত ও উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদানের কারণে ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর পর এবার তার বড় ভাই আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে একই কারণে দল থেকে বহিষ্কার হতে হচ্ছে। রবিবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে লতিফ সিদ্দিকীকে বহিষ্কারের পাশাপাশি দল ও সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে অযাচিত ও অতিকথনের সঙ্গে জড়িত দলের মন্ত্রী-নেতাদের বিরুদ্ধেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতে পারেন দলটির প্রধান শেখ হাসিনা। নিজের ব্যক্তিগত মতামত দল ও সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বেকায়দায় ফেলার সঙ্গে জড়িত যত বড় নেতা বা মন্ত্রীই হোন, আগামীতে সবাইকে যে লতিফ সিদ্দিকীর মতোই ভাগ্যবরণ করতে হতে পারে, সেটিও স্পষ্টভাষায় প্রধানমন্ত্রীও বৈঠকে জানিয়ে দিতে পারেন বলে মনে করছেন কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। তারা বলেন, বিরোধী দলের পরিবর্তে খোদ সরকারি দলের সিনিয়র নেতা ও মন্ত্রীদের একের পর এক লাগামহীন বেফাঁস মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডে মাঝে মধ্যেই বিব্রত অবস্থায় পড়তে হচ্ছে সরকারের হাইকমান্ডকে। সরকারের বিশাল অর্জন ও বিশ্বব্যাপী গড়ে ওঠা ইতিবাচক ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো হচ্ছে। রবিবারের বৈঠকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থান পেতে পারে। সেটি হলো আওয়ামী লীগের ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ২৫ জেলার সম্মেলন আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ। একই সঙ্গে এই সময়ের মধ্যে সারাদেশের মেয়াদোত্তীর্ণ ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও থানা শাখা কমিটির সম্মেলনও ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেবে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।
জানা গেছে, গত তিন দফা সময়সীমা নির্ধারণ করেও সারাদেশে আওয়ামী লীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সম্মেলন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ গত ৯ জুন ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সভাপতিত্বে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে দুই মহানগর ও পাঁচ জেলার কাউন্সিল সম্পন্ন করা হবে। এছাড়া পর্যায়ক্রমে মেয়াদোত্তীর্ণ সব শাখা সংগঠনের কাউন্সিল করা হবে।
এসব জেলা ও মহানগর শাখার কাউন্সিলের সম্ভাব্য তারিখও ঘোষণা করা হয়। এরমধ্যে ২১ জুন মুন্সিগঞ্জ, ২৬ জুন বরগুনা, ২৭ জুন পটুয়াখালী, ২৮ জুন কিশোরগঞ্জ, ১২ জুলাই ঠাকুরগাঁও, ১৫ জুলাই খুলনা মহানগর ও ১৯ জুলাই রাজশাহী মহানগর শাখার কাউন্সিল করার ঘোষণা দেয় দলটি। কিন্তু তা আজও বাস্তবায়ন করতে পারেনি আওয়ামী লীগ। এক্ষেত্রে শাখা সংগঠনগুলোর সব ধরনের প্রস্তুতি থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের সময়ের অভাবে মাত্র একটি জেলা ছাড়া ঘোষিত অন্য কোনো শাখার কাউন্সিল হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্ধারিত তারিখে শুধুমাত্র মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল হয়। বার বার লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় দলের হাইকমান্ড রীতিমতো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সম্মেলন দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ কয়েকবার সাংগঠনিক সম্পাদকদের তাগিদও দিয়েছেন।
তিনবার ক্ষমতায় আসা দেশের বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগের ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার এক তৃতীয়াংশ জেলায় দীর্ঘদিন ধরে সম্মেলন হয়নি। অধিকাংশ জেলায় মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে কার্যক্রম। রংপুর, গাইবান্ধা ও সিরাজগঞ্জসহ অন্তত ১৫টি জেলা কমিটি চলছে ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে। এরমধ্যে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, কিশোরগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও মাদারীপুর জেলা কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে এক যুগের বেশি সময়। গোপালগঞ্জে ১০ বছর, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের এলাকা কিশোরগঞ্জে ১৬ বছর এবং পিরোজপুরে ২১ বছর ধরে কোন সম্মেলন হয় না।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন ইত্তেফাককে জানান, রবিবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকের মূল এজেন্ডা হলো আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী প্রসঙ্গ। তার অপরাধের গুরুত্ব ও গভীরতা বিবেচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে শাস্তি দেবে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল হানিফ জানান, দলের কেন্দ্রূীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, দলের সাংগঠনিক বিষয় ও চলমান রাজনীতি এই তিনটি বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।