ভূতের ভয় ছিল বাহাদুর শাহ্ পার্ক এলাকায়

ভূতদের যে আজকাল খুব দুর্দিন তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখন ভূতের ভয় দেখাতে গেলে বাচ্চাকাচ্চারা পর্যন্ত দুধের দাঁত বের করে হাসে। কিন্তু দিন সবসময় এমন ছিল না। কিছু দিন আগেও সন্ধের পর ভূত-পেত্নীর ভয় বেশ জেকে বসত মানুষের মনে। গাঁও গ্রামে তো বটেই এই ঢাকা শহরের বাসিন্দাদের মধ্যেও ভূতের ভয় কম ছিল না। এখন যেখানে বাহাদুর শাহ পার্ক, দেড়শ দুশ’ বছর আগে সেখানে ছিল একটা বড়সড় খোলা মাঠ। বড় বড় গাছপালাও ছিল অনেক। দুই একটা আশশ্যাওড়া গাছ থাকাও বিচিত্র নয়। সন্ধ্যে নামলে ঢাকাবাসী এদিকে খুব একটা মাড়াত না—ভূতের ভয়ে।

আঠারশ শতাব্দীর শেষের দিকে এখানে ছিল ঢাকার আর্মেনীয়দের একটা ক্লাব ঘর। সেখানে বিলিয়ার্ড খেলতে আসত আর্মেনীয়রা। বিলিয়ার্ডের বল দেখতে অনেকটা ডিমের মত। তাই ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দারা সেই ক্লাবঘরটাকে বলত আন্ডাঘর বা আন্টাঘর। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের মতে, ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এই ক্লাবটা আর্মেনীয়দের কাছ থেকে কিনে নেয় ইংরেজরা। সেই ‘আন্ডাঘর বা আন্টাঘর’ ততদিনে পুরানো হয়ে গেছে। ইংরেজরা সেটাকে ভেঙ্গে ফেলে একটা মাঠের মত তৈরি করল। মাঠটাকে লোকে বলত ‘আন্টাঘর ময়দান’। আগেই বলা হয়েছে, বড় বড় গাছ ছিল এখানে। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় বেশ কয়েকজন বিদ্রোহী সিপাহিকে ইংরেজরা ধরে এসব বড় বড় গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয়। সিপাহি বিদ্রোহ ছিল ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এই দেশবাসীর প্রথম ব্যাপক প্রতিবাদ। যাই হোক, সিপাহিদের এখানে ফাঁসিতে ঝোলানোর পর এই ময়দানে ভূতের কুখ্যাতি নিয়ে নানা কল্পকাহিনী হাত-পা মেলতে থাকে এলাকায়। ফলে সন্ধ্যের পর তো বটেই দিনের বেলাতেও এই ময়দানের আশপাশ দিয়ে হাঁটাচলা করতে সাহস পেত না এলাকাবাসী।

১৮৫৮ সালে ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়া উপমহাদেশের শাসনভার গ্রহণ করলে তার সেই ঘোষণাপত্র পাঠ করে শোনানো হয়েছিল এই আন্টাঘর ময়দানে। সেই থেকে জায়গাটার নাম হয়ে যায় ভিক্টোরিয়া পার্ক। তবে ১৯৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের শতবর্ষ উপলক্ষে ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’ নাম পাল্টে সিপাহি বিদ্রোহের মহানায়ক, শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নামে করা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক। সম্রাট বাহাদুর শাহ ছিলেন কবি, দার্শনিক, মানবদরদী এবং দেশপ্রেমিক। উর্দুতে বহু কবিতা রচনা করেন তিনি। তার রচিত অনেক গজল আজো জনপ্রিয়। সিপাহি বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে ইংরেজরা তার বিচার করে বর্মাতে (বর্তমান মিয়ানমার) নির্বাসনে পাঠায়। মৃত্যুর আগে এই সুফি সাধক, মরমি কবি, শেষ মোগল সম্রাট, আমাদের গৌরবোজ্জল সিপাহি বিদ্রোহের মহানায়ক লিখেছিলেন, ‘কিতনা হু বদনসিব জাফর দাফন কে লিয়ে দো গজ জমিন ভি না মিলি কু-এ-য়ার মেঁ’। যার অর্থ হল, জাফর এমনই দুর্ভাগা যে, তার দাফনের জন্য প্রিয় জন্মভূমিতে মাত্র দুই গজ জমিও জুটল না। দু:খজনক হল, খাতাপত্রে বাহাদুর শাহ পার্ক হলেও লোকমুখে জায়গাটার নাম ভিক্টোরিয়া পার্কই রয়ে গেছে ঔপনিবেশিক আমলের দাসত্বের স্মারক হিসাবে।