ছোটদের জন্য ‘আর্ক কিডস’

পুরো ঢাকা শহরের মোট জনসংখ্যার তিনভাগের একভাগই শিশু, অর্থাত্ তাদের বয়স আঠারোর নিচে। শিশুদের জন্য এই শহরে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ আছে কী? থাকলে তা বসবাসযোগ্য এলাকার কত শতাংশ? এমন প্রশ্ন করতেই এক শিক্ষার্থীর উত্তর, দুই শতাংশ হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত পরিসংখ্যানে জানা গেল, সেই সংখ্যা দুই শতাংশেরও কম। তাহলে বিকেলবেলা খেলাধুলার সুযোগ পাচ্ছে ক’জন? আর যে ক’টি মাঠ বা খোলা জায়গা আছে, তার সব ক’টিতে উপযুক্ত পরিবেশ আছে কী?

এমন আলাপচারিতা হচ্ছিল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক ও একদল স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীর মাঝে। গত সোমবার সকালে  শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালায় আর্ক কিডস প্রোগ্রাম আয়োজন করা হয়। মূলত স্থাপত্য বিভাগের ১৬ বছরপূর্তিতে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী ‘আর্ক উইক ২০১৯’-এর অংশ হিসেবে ছিল আর্ক কিডসের এবারের পর্ব। রাইট টু প্লে শিরোনামে আয়োজিত এ পর্বে টিঅ্যান্ডটি আদর্শ গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল ও পরিজাত শিক্ষাঙ্গনের একদল শিক্ষার্থীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

স্কুলপড়ুয়া শিশুদের জন্য ২০০৪ সাল থেকে এই আয়োজন করছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ। আর্ক কিডস প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য শিশুদেরকে পরিবেশ, বাসস্থান, শহরের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধান সম্বন্ধে সচেতন করা। এটি পরিচালনা করছেন স্থাপত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. হুরায়রা জাবীন। উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন স্কুল অব ডিজাইনের ডিন অধ্যাপক ড. ফুয়াদ হাসান মল্লিক, স্থাপত্য বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. জায়নাব ফারুকী আলী ও ড. মোহাম্মদ  ফারুক। ওয়ার্কশপ কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করছেন বিভাগের শিক্ষক তাসফিন আজিজ, তাসমিয়া  কামাল ও নুহা আননূর পাবণী। আর স্থাপত্য বিভাগের বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন এতে।

সকাল ১১টায় শুরু হয় প্রোগ্রাম। শুরুতেই স্বেচ্ছাসেবকরা স্বাগত জানান তিনটি স্কুল থেকে আসা শিক্ষার্থীদের। টি-শার্ট পড়ে সবাই চিত্রশালার গ্যালারিতে গোল হয়ে বসতেই পরিচিতি পর্ব শুরু করেন ড. হুরায়রা জাবীন। শুরুতেই দেখানো হয় অনেকগুলো বহুতল ভবনে ঘেরা একটি এলাকার ছবি। ‘এটি কোথাকার ছবি?’ কো-অর্ডিনেটর তাসফিন আজিজের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষার্থীরা সমস্বরে উত্তর দেয়, ‘ঢাকা’! পরে দেখানো হয় জনসংখ্যার পরিসংখ্যান। শিশুরা খেলার সুযোগ পাচ্ছে কি-না, জনসংখ্যার অনুপাতে শহরে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ আছে কি-না—এ রকম নানা বিষয় নিয়ে আলাপ হতে থাকে। তিনদিকে ভবন, মাঝে অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি জায়গার ছবি দেখিয়ে বলা হয়, ‘এটি যদি খেলার মাঠ হয় তবে তোমরা সেখানে খেলতে যাবে?’, না সূচক উত্তরে শিক্ষার্থীরা বলে, ‘এখানে খোলা জায়গা নেই, ঘাস নেই, বসার জায়গা নেই।’ সুতরাং কেমন খেলার মাঠ চাই, এ নিয়ে আলাপচারিতা চললো আরো কিছুক্ষণ। তারপর বিরতি। যথারীতি হালকা নাশতার পর্ব শেষে শিক্ষার্থীদেরকে ভাগ করে দেওয়া হল চারটি গ্রুপে। এতক্ষণ খেলার মাঠ নিয়ে যা ভাবা হলো, এবার তা বাস্তবে করে দেখাতে হবে! চারটি গ্রুপের হাতে দেওয়া হল ঢাকার চার এলাকার চারটি মাঠের ম্যাপ। বলা হলো, ওখানে কী আছে সেটা চিন্তা না করে তোমরা তোমাদের মনের মতো করে মাঠগুলোকে সাজাও। কী কী লাগবে, সেই তালিকায় এক এক করে শিক্ষার্থীরা কাগজে লিখলো ঘাস, চারপাশে গাছপালা, ক্রিকেট পিচ, গোলপোস্ট, বসার জায়গা, দোলনা, ডাস্টবিন, টয়লেট, সাইকেল স্ট্যাণ্ড, ফুটপাত ইত্যাদি। এবার রঙিন কাগজ, শোলা ও রঙ-পেন্সিল ব্যবহার করে ছোট ছোট মডেল বানিয়ে সেগুলো মাঠে বসানোর পালা। স্থাপত্য বিভাগে পড়ুয়া স্বেচ্ছাসেবকদের সাহায্য নিয়ে আনন্দের সঙ্গে কাজগুলো করতে থাকলো ছোটরা। কেউ তখন আঁকছে, কেউ গাছ বানাচ্ছে, কেউ ছোট কাগজের টুকরো মাঠের মাঝখানে বসিয়ে ক্রিকেট পিচের রূপ দিচ্ছে। চারকোনা শোলার টুকরো দিয়ে একপাশে বসানো হলো টয়লেট। অন্যদিকে আরেকজন দোলনা তৈরি করলো। ঘণ্টাদুয়েক পর তৈরি হয়ে গেল তাদের স্বপ্নের খেলার মাঠের মডেলগুলো।

কাজ শেষে এবার প্রেজেন্টেশনের পালা। এতে অংশ নিলেন স্থাপত্য বিভাগের চেয়ারপারসন জায়নাব ফারুকী আলী। উচ্ছ্বলতার সাথে ছোটরা তুলে ধরলো তাদের খেলার মাঠ নিয়ে পরিকল্পনাগুলো। প্রেজেন্টেশন পর্ব শেষে চেয়ারপারসন অংশগ্রহণকারীদের সবার হাতে সার্টিফিকেট তুলে দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘ছোটদের জন্য এই আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে বাস্তব বিভিন্ন পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করা, যাতে করে তারা সেটির সমাধান সম্পর্কে ভাবতে শেখে।’

সবশেষে স্কুলপড়ুয়াদের সঙ্গে আসা স্কুল শিক্ষকরাও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এমন আয়োজন যেন নিয়মিত করা হয়।’ পরে দলবেঁধে ফটোসেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পুরো আয়োজন।