দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলজুড়ে জেলেদের জীবনে সঙ্কট নিত্যদিনের, নেই সমাধান। জেলে পরিবারগুলোতে নারী অবহেলা, বৈষম্য আর নির্যাতনের শিকার ভাগ্য বিড়ম্বিত এক জীবন। দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসারের বোঝা চাপে নারীর ওপর। তারা মাছ ধরে। উত্তাল নদী পাড়ি দিয়ে জাল ফেলে। অনেক আশা নিয়ে জাল টানে। কখনো মাছ মেলে, কখনো মেলে না। এভাবেই হাল ধরতে হয় নারীকে। ভূখণ্ডে জেলে পরিবারের নেই কোনো থাকার স্থান। বংশ পরম্পরায় ঠাঁই মিলেছে নৌকায়। মাছ ধরা হয়ে উঠেছে জীবিকার প্রধান অবলম্বন। ঝড় কিংবা অন্যকোনো দুর্ঘটনায় পড়েও নদী ছাড়তে পারেন না। ভয় উপেক্ষা করে তাকে নামতে হয় রোজগারের তাগিদে।
জেলে পরিবারের একটি নৌকার বাসিন্দা ৫ সন্তানের পিতা ৬০ বছর বয়সী আ. কাদের সরদার। কাদেরে স্ত্রী জোলেখা বেগম। তার বয়স পঞ্চাসের কোঠায়। চার ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাদের সংসার। পেটের তাগিদে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আড়িয়াল খাঁ, কালাবদর থেকে মেঘনা-তেঁতুলিয়া ঘুরে বেড়ান তারা। তাদের মতোই অর্ধশত জেলে পরিবার মেঘনার অথৈ জলরাশিতে শিশুসহ বৃদ্ধদের নিয়ে উপচেপড়া ঢেউ উপেক্ষা করে রূপালি ইলিশসহ অন্যান্য মাছ শিকারে নামে। এসব মাছ বিক্রি করেই চলে তাদের জীবন-জীবিকা।
নৌকার পরিবারে গিয়ে দেখা গেছে নারী বৈঠা ধরে আছেন, পুরুষ ব্যস্ত জাল ফেলতে, আর নৌকার গলুইয়ে খেলছে শিশুরা। নৌকা চলছে কখনো মাছ ধরার উদ্দেশ্যে, আবার কখনো কিনার পানে। এমন দৃশ্য উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় চোখে পড়ে। রোজগারের তাগিদে দিনরাত পরিশ্রম শেষে পুরুষরা হাট-বাজারে মাছ বিক্রি করতে গেলে নারীরা রান্না-বান্না, সন্তান লালন-পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
কালাবদর নদীর লাহারহাট মোহনার জোলেখা বেগম (৫৫) জানান, জন্ম হয়েছে নৌকায়, বিয়ে হয়েছে নৌকায়, সারাজীবন মাছ ধরা পেশায় রোজগার করছেন। নদীতে মাছ ধরা শেষে নৌকা ভেরে এই ঘাটে। হাট-বাজার, রান্না, খাওয়া-দাওয়া, অবশেষে আবার মাছ ধরার পালা শুরু। জোলেখা বেগমের ২ ছেলে ও তিন মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর নাতীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ জনে। এই ১০ জনেরই জন্ম নৌকায়। জোলেখার ন্যায় অন্য নারীরা বলেন, ‘নদী আমাদের বাঁচাইয়া রাখে। মাছ পাইলে আমরা বেশ ভালো থাকি, মাছ না পাইলে দেনায় জড়িয়ে পড়ি। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের নামে যে সহায়তা আসে, তা আমরা পাই না। নৌকায় থাকি বলে আমাদের নাম তালিকায় ওঠে না। আমরা কী এদেশের নাগরিক না? সব জায়গায় আমাদের মাছ ধরতে বাঁধা। আমরা কোথায় জাল ফেলবো। এদেশের নাগরিক হয়ে আমরা ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছি। আমাগো কথা শোনার কেউ নাই। আমাগো সমস্যা কে সমাধান করবে?’
উপকূলের বিভিন্ন স্থানে ভাসমান জেলে সম্প্রদায়ের দেখা মেলে। কালাবদর নদীর লাহারহাটসহ ভোলা সদরের ইলিশা, মনপুরার কলাতলী, তজুমদ্দিনের মাছঘাট, পটুয়াখালীর গলাচিপা, চরমোন্তাজ, লক্ষ্মীপুরের রামগতি, কমলননগর, মতিরহাট, মজুচৌধুরীর হাট, মেহেন্দিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাসমান জেলেরা দলবেঁধে বসবাস করে। নদীতে বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরা শেষে এরা আবার নিজেদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে ফিরে আসে। এই পরিবারগুলো পুরোপুরি জেলে পরিবার। স্থায়ী ঠিকানা বলে এদের কিছু নেই। তাই নারী-পুরুষ এবং শিশু সকলেই একসঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে যায়। এই সমাজে বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের মাছ ধরায় দক্ষতাকে বিশেষ গুণ হিসেবে দেখা হয়। মাছ ধরার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে একাধিক জেলেরা বলেন, ‘জীবনভর নৌকায় থেকেছি, মাছ ধরেই জীবন চালাচ্ছি। মাছ ধরতে গিয়ে বহুবার ঝড়ের কবলে পড়েছি। কিন্তু জেলেদের নিরাপত্তায় নেই কোনো ব্যবস্থা। ভূখণ্ডের মানুষের কাছে আমরা সমাজের বাইরের লোক। সে কারণে তাদের কোনো সহায়তাও পাওয়া যায় না। সরকারের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত।’ আশ্রয়ন প্রকল্প হলে আগে তালিকায় নাম ওঠে ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের। নৌকায় যারা মাছ ধরে তাদের অনেকেই দেনার দায়ে জর্জরিত। কেউ টাকা আনে মহাজনের কাছ থেকে, কেউবা এনজিওগুলো থেকে। তারা আরো জানান, মা ইলিশের সময় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা ও ৮ মাসের জাটকা ইলিশ নিষেধাজ্ঞার সময় তাদের সরকারিভাবে সহযোগিতা প্রদান করলে এভাবে অনাহারে কাটাতে হতো না। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে অসহায় গরিবদের নানা সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। অন্যান্যের সাথে তাদেরও সেখান থেকে সাহায্য সহযোগিতা করলে এভাবে তীব্র শীতে কিংবা বর্ষা মৌসুমে কষ্ট পেতে হতো না।
জেলে সম্প্রদায়ের নেতারা জানান, নৌকাতে জন্মানোর পর তাদের পরিচয় হয় ‘ব্যাবাইজ্জা’ নামে। এ নামটি যুক্ত হওয়ার সাথে সাথে তারা চিকিত্সা, শিক্ষাসহ অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। সন্তানদের পড়াশোনার জন্য স্কুলে ভর্তি করা হলে নদী থেকে তীরে উঠলেই ব্যাবাইজ্জা বলে নানাভাবে উপহাস করা হয়। এতে করে সন্তানদের সাথে বিবাদের সৃষ্টি হয়। সামান্য বিবাদে ডাঙায় থাকা লোকজন হামলা চালালে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিতে হয় তাদের। শিশু থেকে কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ সকলেরই একটাই কাজ মাছ ধরে বিক্রি করে পেট চালানো। কিন্তু শুকনো মৌসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে মাছের আকাল দেখা দেওয়ায় ধার-দেনা ও চড়া সুদে টাকা এনে চলতে হয় তাদের। তাদের ভিটেমাটি না থাকায় কোনো এনজিও বা প্রতিষ্ঠান ঋণ দেয় না। ব্যক্তির কাছ থেকে কেউ কেউ চড়া সুদে ঋণ নিলে মৌসুমে তা কেউ কেউ শোধ করতে সক্ষম হয়। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে জেলেদের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা তারা পান না। অর্ধেক জেলের ভোটার আইডি কার্ড থাকলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে সরকারের সুযোগ-সুবিধা চাইতে গেলে তাড়িয়ে দেয়। তাই তারা আর কোনো সাহায্য-সহযোগিতার জন্য কারো কাছে যেতে সাহস পায় না। আর এভাবে চলতে চলতে মৃত্যুবরণ করলে বিভিন্ন এতিমখানার কবরস্থানে কবর দিয়ে আসে পরিবারের সদস্যদের। কোনো প্রকার চিকিত্সকের পরামর্শ ও স্বাস্থ্য সেবা ছাড়াই নৌকায় শতশত শিশু জন্ম নিচ্ছে। শুধুমাত্র প্রসব বেদনার মুখোমুখি গর্ভবতী মায়েদের একটি পৃথক নৌকায় নিয়ে ২/১ জন বয়স্ক মহিলা সন্তান প্রসবে সহায়তা করেন। শিশু সন্তানের জন্মের পরই বহরের সকল নৌকার ঢল নামে নবজাতক শিশু ও প্রসূতি মাতাকে দেখার জন্য। কিন্তু নবজাতককে জন্মদানকারী মা কিংবা নবজাতক শিশুর জন্য কোনো চিকিত্সার ব্যবস্থা করা হয় না।