মায়ের বুকের দুধের বিকল্প শিশুখাদ্য খেয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০০ শিশু মারা যাচ্ছে। গ্রামের এমনকি শহরের শিক্ষিত অভিভাবকরাও ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে তাদের শিশু সন্তানদের খাওয়াচ্ছেন নানা বিকল্প শিশুখাদ্য। তারা জানেই না এসব খাদ্যে শিশুর পুষ্টি সহায়ক কোনো উপাদান নেই। বিজ্ঞাপনের তথ্যে বিভ্রান্ত হয়ে তারা তাদের সন্তানের মুখে তুলে দিচ্ছেন একপ্রকার বিষই।
মায়ের বুকের দুধের বিকল্প আর কিছুই হতে পারে না এটা অনেক অভিভাবক জেনেও মানেন না। শিশুকে আরো শক্তিশালী ও পুষ্টি দিতে তারা তাদের মুখে তুলে দিচ্ছেন বিকল্প খাদ্য।
বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন দেশের খ্যাতনামা শিশু বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগ, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে আগত শিশুদের উপর জরিপ চালিয়ে জন্মের পর থেকে গুড়া দুধসহ বিকল্প শিশু খাওয়ানোর ফলে অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে। পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের মতে, বিকল্প খাদ্য খেয়ে শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগে। তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠে না। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, চামড়ায় ঘা, রক্ত স্বল্পতা, অন্ধত্বসহ নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হয় এসব শিশুরা। এভাবে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ও অপুষ্টিজনিত কারণে প্রতিদিন ৫ বছরের কম কমবয়সী প্রায় ২০০ শিশু দেশে প্রাণ হারাচ্ছে।
গুড়া দুধসহ বিকল্প শিশু খাদ্য ব্যবহার, বাজারজাতকরণ ও বিজ্ঞাপন প্রচারণা বন্ধে সরকার ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্য (বিপণনের নীতিমালা) অধ্যাদেশ’ রহিত করে নতুন একটি আইন করে। ২০১৩ সালে প্রণীত আইনে শিশুখাদ্য বিপণন প্রক্রিয়া আরো কঠোর করা হয়েছে। নতুন আইনে বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গড়া কমিটির ছাড়পত্র পেলে সরকারের পুষ্টি প্রতিষ্ঠান গুড়া দুধ বাজারজাতকারীদের রেজিস্ট্রেশন দেবে। তারপর দুধ বিক্রি করতে হবে।
জানা গেছে, বিকল্প খাবার বাজারজাতকরণে যে নিয়মনীতি রয়েছে তা গুড়া দুধসহ বিকল্প শিশু খাদ্য বাজারজাতকারীরা মানছেনা। তারা নিজেদের ইচ্ছামত গুড়া দুধসহ বিকল্প শিশু খাদ্য বাজারজাত করে আসছে। গুড়া দুধসহ শিশু বিকল্প খাদ্য বাজারজাতকারীদের দাপটে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন অসহায়। এক শ্রেণির কর্মকর্তা ওই সকল গুড়া দুধসহ বিকল্প খাদ্য বাজারজাতকারীদের থেকে পাচ্ছে নিয়মিত মাসোহারা। এক শ্রেণির ডাক্তারও গুড়া দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে অভিভাবকদের পরামর্শ দেন। এ জন্য ডাক্তার পাচ্ছেন গাড়ি বাড়ি, বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধা।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সিঙ্গাপুর রোটারি ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. সিসলি উইলিয়াম বলেছিলেন, দিনের পর দিন মায়ের দুধের বিকল্প হিসাবে গুড়া দুধের প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যেভাবে শিশুদের গণহত্যা করা হচ্ছে তার জন্য তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। আমি এটাকে কোনভাবেই মৃত্যু বলতে নারাজ। আমি বলবো এটি হত্যা। ব্রিটিশ এই নারী ৭০ বছর আগে যা বলেছিলেন তা এখন বাংলাদেশে হচ্ছে।
বর্তমান সরকার শিশুদের মায়ের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে খুবই সোচ্চার। এজন্য সরকার মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করেছে। মায়েরা যাতে তাদের সন্তানদের বুকের দুধ নির্বিঘ্নে খাওয়াতে পারেন সেজন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একটি কর্নার করার নির্দেশ দিয়েছে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে শিশু জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যেই যেন মায়ের শাল দুধ খাওয়ানো হয়। এবং তা একনাগাড়ে ৬ মাস পর্যন্ত যেন অব্যাহত থাকে। এমনকি এ সময় পানি খাওয়াতেও নিষেধ করা হচ্ছে। ছয় মাসের পর বুকের দুধের পাশাপাশি শাকসবজি, মাছ মাংস ডিম দুধ খাওয়াতে মায়েদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে সচেতনতা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম কিউ কে তালুকদার বলেন, মায়ের দুধ শিশুদের সুন্দরভাবে, সুস্থ হিসাবে গড়ে তোলার একমাত্র খাবার। মায়ের দুধের বিকল্প আল্লাহ সৃষ্টি করেননি। মায়ের দুধ রোগ প্রতিরোধের প্রতিষেধক। মায়েরা বুঝে না বুঝে প্রচার-প্রচারণায় বিভ্রান্তি হয়ে জন্মের পর থেকে বুকের দুধের পরিবর্তে গুড়া দুধসহ বিকল্প শিশু খাদ্য খাওয়াতে শুরু করে। এটা মা তার সন্তানকে যেন বিষ খাইয়ে হত্যা করছে। তিনি বলেন, গুড়া দুধসহ বিকল্প শিশু খাদ্য খাওয়ায় শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে। জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। যে শিশু বেঁচে যায় তারাও হাবাগোবা ও বুদ্ধিহীন হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের নতুন প্রজন্ম যাতে অপুষ্টিতে ভুগে, মেধাহীন, বুদ্ধিহীন হয় সেজন্য আন্তর্জাতিক দুগ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে শিশুখাদ্য বিক্রি করছে। তারা যেভাবে আমাদের দেশে এসব খাদ্য বিক্রি করছে, তা পৃথিবীর অন্য কোন দেশে করতে পারে না।
এই শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, শিশুদের তারা হত্যা করছে। যা কোন সভ্য জাতি মেনে নিতে পারে না। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের পরামর্শ ছাড়া বিকল্প খাবার খাওয়ানো থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, এক শ্রেণির মা আছেন, যারা নিজেদের স্লিম রাখতে বুকের দুধ খাওয়াতে চান না। আবার এমনও অভিভাবক আছেন, তারা মনে করেন খালি বুকের দুধ খেলে শিশুদের পুষ্টি হয় না। এ জন্য বুকের দুধের পাশাপাশি গুড়া দুধ কখনো বুকের দুধ না খাইয়ে গুড়া দুধসহ বিকল্প শিশু খাদ্য খাওয়াতে শুরু করেন।
জাতীয় অধ্যাপক ও প্রখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম আর খান বলেন, আল্লাহ নিজে সংবিধান করে দিয়েছেন মায়ের দুধের কোন বিকল্প নেই। মায়ের দুধ সন্তানের জন্য আর পশুর দুধ তার সন্তানের জন্য। মায়ের দুধের বিকল্প খাদ্য খাওয়ালে শিশুর ক্ষতি নিশ্চিত বলে জানান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই শিশু বিশেষজ্ঞ।
জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মো. শাহ নেওয়াজ বলেন, আগের মতো ঢালাও ভাবে কোন কোম্পানিকে দুধ বিক্রির অনুমতি দেয়া হবে না। প্রচার প্রচারণার ব্যাপারে আমরা কঠোর হচ্ছি। সংশোধিত আইনের বাইরে কোন কোম্পানিকে গুড়া দুধসহ বিকল্প শিশু বাজারজাত করার অনুমোদন দেয়া হবে না।
নতুন এই আইনের অধীনে নীতিমালা প্রণয়নে একটি কমিটি করা হয়েছে এতে ১৬টি মন্ত্রণালয়, বিশ্ব ব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ও শিশু বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন।