আজ ১৬ অক্টোবর পহেলা কার্তিক, বাউল সম্রাট মহামতি ফকির লালন সাঁইয়ের ১২৪তম তিরোধান দিবস। এ উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের ছেঁউড়িয়া লালন আখড়াবাড়িতে আজ থেকে শুরু হচ্ছে পাঁচ দিনব্যাপী লালন স্মরণোত্সব। এবার উত্সবের শিরোনাম করা হয়েছে:‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’।
গড়াই নদী তীরের শান্ত-স্নিগ্ধ শহর কুষ্টিয়ার পাশেই কুমারখালী উপজেলা। উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ছেঁউরিয়া গ্রাম। সেখানেই লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ি। মরমী সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের স্মরণানুষ্ঠান উপলক্ষে এই আখড়াবাড়িতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দলে দলে মানুষ এখন ভিড় জমাচ্ছেন ছেঁউরিয়ায়। সাঁইজির সান্নিধ্য লাভের আশায় তারা ছুটে এসেছেন এখানে। বাউলদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে গোটা ছেঁউরিয়া।
বাংলা ১২৯৭ সালের আজকের এই দিনে দেহত্যাগ করেন ফকির লালন সাঁই। সেই থেকে প্রতি বছর ফকির লালনের তিরোধান দিবসে আয়োজন করা হয় এই স্মরণানুষ্ঠানের। যুগ যুগ ধরে চলে আসা লালনের তিরোধান দিবসের এই আয়োজন এখন রূপ নিয়েছে এক অকৃত্রিম ভালোবাসার উত্সবে। এ এমন এক উত্সব; যাতে বয়স, ধর্ম, বর্ণ ও আয় নির্বিশেষে সকলেই শামিল হোন এক কাতারে। কেবল অঞ্চলভিত্তিক অংশগ্রহণকারীরাই এই মেলায় উপস্থিত হননি, সারাদেশের নানা প্রান্ত, এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও লালনভক্তরা এসে হাজির হয়েছেন এ উত্সবে।
গতকাল বুধবার দুপুরে সরেজমিনে সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, সাধক লালনের আধ্যাত্মিক দর্শন লাভের আশায় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ প্রাণের টানে ছুটে এসেছেন আখড়ায়। একতারা, দোতারা, ঢোল ও বাঁশির সুরে মুখরিত হয়ে উঠেছে লালনভূমি ছেঁউড়িয়া। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বাউলেরা দরদভরা কণ্ঠে গাইছেন লালনের রেখে যাওয়া সব আধ্যাত্মিক গান। শুধু তাই নয় তারা জাত, কূল, ধর্ম, গোত্র ভুলে একে অপরের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান করছেন।
আখড়ায় দেখা মিললো অসংখ্য বাউলের; যারা সারাজীবন উত্সর্গ করেছেন লালনের দর্শনের সন্ধানে। বাউলদের কেউ কেউ এসেছেন দল বেঁধে, আবার কেউ এসেছেন একাই। তাদের এই আসার জন্য ছিলো না কোন দাওয়াত পত্র, না ছিলো নিমন্ত্রণ। তবু গুরুর টানে ছুটে এসেছেন।
লালন ভক্তদের মতে, ১১৬ বছর বয়সে বাংলা ১২৯৭ সনের পহেলা কার্তিক, ইংরেজি ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ফকির লালন সাঁই দেহ ত্যাগ করেন। লালনের জন্মস্থান নিয়ে নানা মত থাকলেও নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, তিনি ১৭৭৪ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের ভাঁড়রা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলার এক ক্রান্তিকালে তিনি জন্মেছিলেন সংস্কার-জাতপাত ও শাস্ত্রশাসিত এক ধর্মান্ধ সমাজে। তত্কালীন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠির নির্মম অত্যাচারে গ্রামের সাধারণ মানুষ যখন জর্জরিত, ঠিক সেই সময় সত্যের পথ ধরে, ‘মানুষ গুরু’র দিক্ষা দিতে মানবতার পথ প্রদর্শক হয়ে কুমারখালির ছেঁউড়িয়াতে ফকির লালন সাঁই’র আবির্ভাব ঘটে। তিনি আপন অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও চেতনার মধ্য দিয়ে একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক শক্তির অর্চনা করে তিনি হয়ে উঠেন নিগৃহীত-নিম্নবর্ণের মানুষের ‘পরমপুরুষ’। ফকির লালন সাঁই তার লেখনির (গানে) ভেতর সবার উপর মানুষকে স্থান দিয়েছেন। সে কারণেই তিনি লিখেছেন ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’।
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, উত্সব ঘিরে লালন একাডেমির সকল প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় উত্সব উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। বিশেষ অতিথি থাকবেন কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের সংসদ সদস্য আবদুর রউফ। উত্সব চলাকালে সাঁইজির মাজারের সামনে মরাকালী নদীর তীরে লালন মঞ্চে প্রতিদিন অনুষ্ঠিত হবে লালন সংগীত, লালন গবেষকদের আলোচনা সভা ও লালন মেলা।
প্রসঙ্গত, ছেঁউড়িয়ায় সাঁইজির ধামে প্রতিবছর দু’টি উত্সব উদযাপন হয়। একটি মার্চ মাসে দোল উত্সব, অপরটি পহেলা কার্তিক ১৬ অক্টোবর সাঁইজির তিরোধান দিবস। দু’টি উত্সবই পাঁচ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়।