কর্মপরিবেশের উন্নয়ন বাংলাদেশকেই করতে হবে: মজীনা

জিএসপির ১৬ শর্তই পূরণ হয়েছে: শ্রমপ্রতিমন্ত্রী

 
 
 
 
 
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্থগিত হওয়া জিএসপি-সুবিধা (পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার) ফেরত পেতে ১৬টি শর্ত দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এ সব শর্তের অনেকগুলো এত দিনে পূরণ হলেও ২২২ জন কারখানার পরিদর্শক নিয়োগের শর্তটি ঝুলে ছিল। বৃহস্পতিবার সরকারি কর্মকমিশন ১৮৯ জন পরিদর্শক নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে। এর মাধ্যমে ১৬টি শর্তের সবগুলোই পূরণ হয়েছে বলে মনে করছেন শ্রমপ্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু।
শ্রমপ্রতিমন্ত্রী বলেন, আর কোনো শর্তই পূরণের বাকি নেই। এখন যুক্তরাষ্ট্র কী বলবে জানি না। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্র্যাক সেন্টারে মালিক ও শ্রমিকের সহযোগিতা বৃদ্ধি বিষয়ক এক কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রেও রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিও মজীনাসহ গার্মেন্টস শ্রমিক ও মালিক পক্ষের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে একাধিক বক্তৃতায় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, জিএসপি ফেরতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া প্রায় সব শর্ত পূরণ হয়েছে। এখন জিএসপি না দিলে সেটা হবে রাজনৈতিক কারণে।
অনুষ্ঠানে স্বাধীনভাবে ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগ দেয়া সংক্রান্ত ড্যান মজীনার একটি বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্য করেন শ্রমপ্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা জানতে চাই— আপনাদের দেশে কত শতাংশ কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন দেয়া হয়েছে?’ এ প্রসঙ্গে গ্রাম্য একটি প্রবাদ স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘গরিবের বউ সবার ভাবি।’
শ্রমপ্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে কি গোলামি ছিল না? সেখানে তো কৃষ্ণাঙ্গরা যুগ-যুগ ধরে অবহেলিত ছিল। সেখানেও পরিবর্তনের জন্য মার্টিন লুথার কিং স্বপ্ন দেখেছিলেন। আপনাদের আর আমাদের স্বপ্নে রাত দিন তফাত্। আপনাদের সাথে আমাদের গণতন্ত্র তুলনা করলে হবে না। ৮০০ স্পিকার হত্যার পর বৃটেনে গণতন্ত্র এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো একজন স্পিকারও মার খাননি।’
যুক্তরাষ্ট্রকে ইঙ্গিত করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের দেশের সব কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন আছে কি না, তা জানলে সুবিধা হতো। সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন কিভাবে কাজ করে, কিভাবে বার্গেনিং করে, তা দেখতে চাই। সেই অভিজ্ঞতা নেয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন আশা করি।’
শ্রমপ্রতিমন্ত্রী মালিক-শ্রমিক উভয় পক্ষকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। মন্ত্রণালয়কে এড়িয়ে শ্রম বিষয়ে অন্য দেশের কাছে নালিশ না করতেও শ্রমিক নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আমরা সমাধান করতে ব্যর্থ হলে তখন অন্য দেশের কাছে বলুন।’
শ্রমপ্রতিমন্ত্রীর আগে আলোচনায় অংশ নিয়ে ড্যান মজীনা বলেন, ‘বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত নিয়ে আমার দুটি স্বপ্ন। একটি হলো— বাংলাদেশ নিরাপদ কর্মপরিবেশের মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হবে। অন্যটি হলো— দুর্ঘটনায় শত শত শ্রমিক মারা পড়বে। এই খাত দ্বিতীয় অবস্থান থেকে পিছিয়ে ১২ বা ১৪তম অবস্থানে নেমে যাবে। তবে দ্বিতীয় স্বপ্নটি আসলে দুঃস্বপ্ন। এটি পূরণ হোক, তা আমি কখনোই চাই না।’
মজীনা বলেন, ‘গার্মেন্টস খাত এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। কারখানার মালিক-শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করবে, যাতে আর কোনো রানা প্লাজা বা তাজরীন গার্মেন্টসের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়। শ্রমিকরা ভয়-ভীতিহীনভাবে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে পারলে বিশ্বে বাংলাদেশ ব্র্র্যান্ড গড়া সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে সত্যিকারের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে হবে।’
ড্যান মজীনা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বা কোনো বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক খাতের কর্মপরিবেশর উন্নয়ন করবে না। এই কাজটি বাংলাদেশকেই করতে হবে।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘মালিক-শ্রমিক উভয় পক্ষেরই মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে। আইনগত ও গঠনমূলক ট্রেড ইউনিয়ন চাই। ট্রেড ইউনিয়ন সম্পর্কে অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। তখন এমন ছিল যে, ট্রে্ড ইউনিয়ন নেতা কাজ করবে না। কিন্তু মাস শেষে তাকে বেতন দিতে হবে। আমরা এমন ট্রেড ইউনিয়ন চাই না। এই ট্রেড ইউনিয়নের কারণে পাটখাত এখন অভিশপ্ত হয়ে গেছে। সরকারি ব্যাংকের অবস্থাও ভালো নয়। পাট খাতের শ্রমিকরা এখন বেকার।’
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘ট্রেড ইউনিয়ন কিভাবে চলবে, সেই কাঠামো ঠিক করে দিতে হবে। কোনোভাবেই ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতির সাথে যুক্ত হতে পারবে না। এ থেকে ট্রেড ইউনিয়নকে রক্ষা করতে হবে।’ মালিক ও শ্রমিক পক্ষকে ঠিক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মিয়া-বিবি রাজি থাকলে কাজির দরকার নেই।’
আইএলওর আয়োজনে দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নেন ১৯টি কারখানার ৫৪ জন শ্রমিক ও মধ্যম সারির কর্মকর্তা। কারখানায় শ্রমিক ও মালিক পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমিয়ে আনার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এটি বাস্তবায়ন করছে আইএলও। এ কর্মশালায় অংশ নেয়া ১৯টি গার্মেন্টস কর্মপরিবেশ উন্নয়নে মডেল হবে বলে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা আশা প্রকাশ করেন।
এ সময় অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশে আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর শ্রীনিবাস বি রেড্ডি, শ্রমিক নেতা আমিরুল হক আমিন, বিকেএমইএর সহসভাপতি মনসুর আহমেদ, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের উপদেষ্টা কামরান টি রহমান প্রমুখ।