সারা দেশের চার শতাধিক উপজেলার সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনের জন্য এ সব উপজেলার সীমানা নির্ধারণ ও ভোটার তালিকা প্রস্তুতিও শেষ হয়েছে। আগামী মাসে চতুর্থ উপজেলা পরিষদে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। নির্বাচন হতে পারে আগামী জানুয়ারি মাসে। যদিও তৃতীয় উপজেলা পরিষদের ৫ বছরের মেয়াদ সংরক্ষিত নারী পদে নির্বাচন ছাড়াই শেষ হয়েছে। আইনে সংরক্ষিত নারীদের নিয়ে উপজেলা পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। এতে প্রায় ১৫ শ নারী জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অথচ সারা দেশে ‘পরোক্ষ ভোটে’ ৪৮৭টি উপজেলায় সংরক্ষিত নারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রয়েছে।
সংরক্ষিত নারী পদে নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) নোট দেন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক। এ বিষয়ে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ-১৯৯৮) আইনের ৬ ধারায় ইউনিয়ন পরিষদ এবং পৌরসভার সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরদের মধ্য থেকে ভোট দিয়ে উপজেলা পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য হিসেবে নির্বাচন করার বিধান আছে। নির্বাচনের জন্য সিইসিকে লিখিত দিয়েছি। কিন্তু কিছু উপজেলায় সীমানা নির্ধারণ না করার নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়নি। তার পরও আশা করছি কয়েকটি ধাপে এই নির্বাচনও সম্পন্ন করা যাবে।
ইসি সূত্র জানায়, উপজেলা পরিষদ গঠিত হওয়ার পর এই প্রথম সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। স্থানীয় সরকারের বাধার কারণে বিশেষ করে উপজেলাগুলোর সীমানা র্নিধারণ না হওয়াতে এত দিন নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এ জন্য স্থানীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে বারবার চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। কিন্তু এত দিন এ ব্যাপারে তাদের কোনো সাড়া পায়নি কমিশন। সম্প্রতি বেশ কিছু উপজেলার সীমানা নির্ধারণ করে দেয়াতে নির্বাচন আয়োজনের বাধা দূর হয়েছে। তা ছাড়া সংশ্লিষ্ট উপজেলার ভোটার তালিকা প্রণয়নেও সাড়া পেয়েছে কমিশন। এ পর্যন্ত চার শতাধিক উপজেলার ভোটার তালিকাও হাতে পেয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, অধিকাংশ উপজেলার সংরক্ষিত আসনে নির্বাচনের যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এ সব উপজেলায় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি সম্পর্কে কমিশনকে লিখিতভাবে জানানো হবে। কবে নাগাদ এ নির্বাচন হবে সে সম্পর্কে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।
এর আগে ২০০৯ সালে তৃতীয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন করার উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন। তবে সীমানা নিয়ে জটিলতা থাকায় তা আর সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পর নারী আসনেও নির্বাচনের উদ্যোগ নেয় কমিশন। উপজেলা পরিষদের সীমানা নিয়ে বিদ্যমান জটিলতা দূর করা ও আসন সংখ্যা নির্ধারণ করতে ২০১৩ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগকে চিঠি দেয় ইসি। গত দেড় বছর ধরে বারবার চিঠি দিয়ে ৪৮৭ উপজেলার মধ্যে চার শতাধিক উপজেলার আসন সংখ্যা ও সীমানা নির্ধারণের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়েছে ইসি।
ইসি সচিবালয়ের সহকারী সচিব আশফাকুর রহমান জানান, সীমানা নিয়ে জটিলতা নিরসনের জন্য আট দফায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়। সম্প্রতি ওইসব চিঠির জবাব দিয়েছে তারা। অনেকগুলো উপজেলার সীমানা সংক্রান্ত গেজেটও পাওয়া গেছে। ফলে সংশ্লিষ্ট উপজেলায় নির্বাচনের জন্য দৃশ্যত আর কোনো বাধা নেই।
উপজেলা পরিষদের আইন অনুযায়ী, ‘প্রত্যেক উপজেলার এলাকাভুক্ত ইউনিয়ন পরিষদ এবং পৌরসভার (যদি থাকে) মোট সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের সমসংখ্যক আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকিবে। যাহারা উক্ত উপজেলার এলাকাভুক্ত ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার (যদি থাকে) সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য বা কাউন্সিলরগণ কর্তৃক তাহাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবেন।’ বিধান অনুযায়ী উপজেলাতে ১২টি ইউনয়ন ও পৌরসভা থাকলে উপজেলায় নারীরা সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত আসন হবে ৪টি। ইউপি/পৌরসভার সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরাই সংশ্লিষ্ট উপজেলা পরিষদের সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনে ভোটার এবং প্রার্থী হতে পারবেন। নির্বাচিতদের জন্য এলাকা বণ্টনও করা হবে।
দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারী তৃতীয় উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৮ সালের উপজেলা পরিষদ আইন বাতিল করে বিগত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জারি করা, ‘স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) অধ্যাদেশ ২০০৮ এর মাধ্যমে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জারিকৃত অধ্যাদেশে উপজেলা পরিষদে প্রথমবারের মতো চেয়ারম্যান ছাড়াও একজন নারীসহ ২ জন ভাইস চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিগত মহাজোট সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জারি করা উপজেলা পরিষদ অধ্যাদেশের বিলটি বাতিল করে দেয়। ফলে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ-মহিলা) পদ দুটি বিলুপ্ত হয়। পরে একটি পরিপত্র জারি করে তা আবার বৈধ করে সরকার। নারী সদস্য পদে নির্বাচনী বাধা দূর করতে ২০১১ সালে ২৯ নভেম্বর সংসদে উপজেলা পরিষদ আইন সংশোধন করে বিল পাস করা হয়। সংশোধিত আইনে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেয়া হয়। ২০১৩ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা চূড়ান্ত করে কমিশন। সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদের (৩) উপ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহন ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।’