আট হাজার বিদেশির প্রতারণার জাল

 আফ্রিকা মহাদেশের দশ দেশের অবৈধ ৮ হাজার নাগরিক ঢাকায় প্রতারণার জাল বিস্তার করেছে। জাল ডলার, মাদক ব্যবসা, আদম পাচার, হুন্ডি ব্যবসা, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, ভিওআইপি ব্যবসা, অসামাজিক কর্মকাণ্ড এমনকি জঙ্গি কার্যক্রমের সাথে তারা জড়িয়ে পড়ছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে গত ৫ বছরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে প্রায় পাঁচশ’ নাগরিক গ্রেফতার হলেও জামিনে বের হয়ে আবারও তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এসব অবৈধ নাগরিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
দেশে অবৈধভাবে কত বিদেশি নাগরিক রয়েছেন তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তবে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বৈধ ও অবৈধ বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার। এদের মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশের ১৫ হাজার বৈধ ও অবৈধ নাগরিক দেশে অবস্থান করছে। কঙ্গো, ঘানা, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, আইভরিকোষ্ট, সিয়েরালিওন, সেনেগাল, ক্যামেরুন, ইথিওপিয়া ও লাইবেরিয়া থেকে আগত প্রায় ৮ হাজার নাগরিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। গত ৫ বছর ধরে এসব নাগরিক বিভিন্ন সময়ে দেশে এসে আর ফিরে যায়নি। এরাই বিভিন্ন সময়ে ঢাকায় ভিনদেশীর আড়ালে অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশের বিশেষ শাখার ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গেছে, এদের বেশিরভাগ খেলোয়াড় কোটার পাশাপাশি জাল স্টুডেন্ট ভিসায় দেশে ঢুকছে। স্থলে পথে আসা এসব নাগরিক প্রথমে ভারতে আসার পর দালালদের মাধ্যমে চোরাইপথে দেশে ঢুকছে। এরপর এদেশীয় কতিপয় দালালের সহায়তায় মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে বসবাস করছে। এরা ইংরেজিতে পারদর্শী হওয়ায় যেকোন পরিবেশে নিজেদের উপস্থাপন করে গড়ে তুলছে আন্তজার্তিক সিন্ডিকেট। সেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জাল ডলার, জাল টাকা, জাল মুদ্রার উপাদান, ক্রেডিটকার্ড জালিয়াতি, অস্ত্র ব্যবসা, আদম পাচার, হোরোইন, আফিমের পাশাপাশি বিভন্ন ধরনের মাদক ব্যবসা করছে। একই সঙ্গে অসামাজিক কাজে ব্যাপকহারে লিপ্ত হচ্ছে। এর ফলে আমাদের সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। শিশু বলাত্কারের মত ঘটনাতেও আফ্রিকান নাগরিকদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। এতে পুরো দেশ একদিকে যেমন লজ্জায় পড়ছে বহির্বিশ্বেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে।
গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্র জানায়, দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে এরা উত্তরা, নিকুঞ্জ, বনশ্রী ও বনানী এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে। এসব এলাকায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত বিদেশি নাগরিকরা থাকেন বলে কেউ তাদের সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে না। এছাড়া ভিনদেশীদের সবাই সমীহ করে চলে। এই সুযোগ কাজে লাগায় তারা। কোন বিদেশি নাগরিক বাড়ি ও অফিস ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে মালিকদের কাছে পাসপোর্ট, ভিসা ও কাজের অনুমতিপত্র দেখাতে হয়। কিন্তু বাড়ি  বা অফিসের মালিকরা এসব আফ্রিকান অবৈধ নাগরিকদের কাছে কাগজপত্র না দেখে বেশি টাকার লোভে ভাড়া দিয়ে দেন। আবার এসব অবৈধ নাগরিক উত্তরা, নিকুঞ্জ, বনানী ও মহাখালী এলাকার হোটেলে অবস্থান করার সময়ও তারা পাসপোর্ট ও ভিসা প্রদর্শন করেন না সংশ্লিষ্ট হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে। এসব কারণে এরা সহজেই অপরাধের জাল বিস্তার করে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, বাড়ি বা অফিস ভবনের মালিকদের উচিত বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট ও ভিসা যাচাই করে ভাড়া দেয়া। অবৈধ নাগরিক ধরা পড়লে ঐ মামলায় মালিকদেরও আসামি করা হবে। এ ক্ষেত্রে বাড়ি বা অফিস ভবনের মালিকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন উপ-কমিশনার জানান, গত ৫ সেপ্টেম্বর ইংলিশ মিডিয়াম ছাত্র জুবায়ের আহমেদের (১৭) লাশ উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের খেলার মাঠ সংলগ্ন পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আলজেরিয়ান অবৈধ নাগরিক আবু ওবায়েদ কাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। কাদের মূলত ভাল ফুটবল খেলার পাশাপাশি ইংরেজি ও আরবিতে দক্ষ। ফুটবল কোচ পরিচয়ে উত্তরায় শিশু-কিশোরদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। আর এই ‘বন্ধুত্ব’কে বিকৃত যৌনাচারে রূপান্তর করতে গিয়ে কাদের নৃশংস উপায়ে হত্যা করে ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদকে। শুধু এই আলজেরিয়ান নাগরিক নয়, অতি সম্প্রতি ক্যামেরুনের তিন নাগরিককে উত্তরা এলাকা থেকে জাল ডলারসহ গ্রেফতার করা হয়। এরা হলেন পেরেজ ইফরেইন, সেন কেরিন ন্যাটি ও মিকো স্যান্ডিও নাটালি। কিন্তু এক মাসের মধ্যে তারা জামিনে বের হয়ে আবারও ঐসব অপরাধ কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে ডিবির কাছে তথ্য এসেছে। সম্প্রতি এসব অবৈধ আফ্রিকান নাগরিকদের বিরুদ্ধে যৌন উত্তেজক নিম্নমানের ওষুধ, মানব ভ্রূণ নষ্টকারী গায়োনিক এসিডের অলিভা ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকারক কসমেটিকস সামগ্রীর ব্যবসা করার অভিযোগ রয়েছে।
আফ্রিকার লাইবেরিয়া, সেনেগাল, ঘানাসহ কয়েকটি দেশে প্রাণঘাতি ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ঢাকায় অবস্থানরত এসব অবৈধ নাগরিকদের ব্যাপারে আতংক প্রকাশ করেছেন ডিএমপি’র যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিমানবন্দর ও স্থলবন্দর দিয়ে এসব দেশের নাগরিক যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে অবস্থানরত ঐসব দেশের অবৈধ নাগরিকদের আটক করে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য শিগগির অভিযান চালানো হতে পারে।
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান ইত্তেফাককে বলেন, গত কয়েক বছরে র্যাব বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকা সন্দেহে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের ৯১ জন নাগরিককে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের বেশির ভাগই জঙ্গি, মাদক, জাল মুদ্রা তৈরি ও মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। এরা দেশে ঢুকেই তাদের পাসপোর্ট ফেলে দেয়। ঢাকায় ঐসব দেশের দূতাবাস না থাকায় তাদের নিজ নিজ দেশে পুশব্যাকও করা যায় না। তিনি আরো জানান পোশাক শিল্প, বায়িং হাউস, আইটি ও টেলিকম সেক্টর, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, রেস্টুরেন্ট এবং এনজিওসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানের ঢাল ব্যবহার করে তারা অপরাধ কর্মকাণ্ড করে থাকে।
ডিবির গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, আফ্রিকার এসব দেশ থেকে ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে খেলতে আসেন খেলোয়াড়। এদের মধ্যে অনেক খেলোয়াড় ক্লাবের সাথে চুক্তি করতে পারেন না। পরে তারা আর দেশে ফিরে না গিয়ে ঢাকায় অবস্থান করে অবৈধ কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন। এরকম প্রায় দুইশ’ আফ্রিকান নাগরিক ঢাকায় খেলতে এসে আর ফিরে যাননি।