প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। তবে সরকারের এই কর্মপ্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে-যদি ইবোলা আক্রান্ত পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশের সময় কার্যকর স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে পশ্চিম আফ্রিকার প্রায় আট সহস্রাধিক নাগরিক রয়েছে। বৈধ-অবৈধ পথে তারা এসেছে বাংলাদেশে। এদের চিহ্নিত করা ও তারা ইবোলা আক্রান্ত কিনা এটা নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চ্যালেঞ্জ। জানা গেছে, পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর দূতাবাস নেই বাংলাদেশে। ওই সব দেশের নাগরিকরা পার্শ্ববর্তী দেশে এসে পরে বিভিন্ন পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, লাইবেরিয়া, সিয়েরালিওনসহ পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আগত বাংলাদেশিরা বিমানবন্দরে নিজ থেকেই জানাচ্ছে যে, তারা সেখান থেকে এসেছে। পরে সময় নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করা হচ্ছে।
পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা ভাইরাস সংক্রমণে সাড়ে ৪ হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ওই সব দেশের নাগরিকদের অন্যদেশে প্রবেশের সময় সতর্কতার সঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার নির্দেশ দেয়। সমপ্রতি বাংলাদেশের দুটি গোয়েন্দা সংস্থা দেখতে পায়, পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর প্রায় আট সহস্রাধিক নাগরিক বৈধ-অবৈধভাবে এদেশে অবস্থান করছে। সমপ্রতি বেনাপোল সীমান্তপথ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশকালে পশ্চিম আফ্রিকার ১০ জন নাগরিককে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ চিহ্নিত করে। পরে তাদের জিজ্ঞাসা করে জানা যায়, ট্যুরিস্ট ভিসায় ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসছিল তারা।
চেকপোস্টে কর্তব্যরত স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছে। তাদেরকে ২১ দিন স্বাস্থ্য কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য এবং এসময়টা আলাদা থাকতে পরামর্শ দেয়া হয়। ২১ দিনের মধ্যে ইবোলা ভাইরাসের উপসর্গ দেখা না দিলে তাদেরকে মুক্তভাবে চলাফেরার পরামর্শ দেবে চিকিত্সকরা।
গোয়েন্দা সংস্থা দুটি পশ্চিম আফ্রিকার নাগরিকদের অবৈধভাবে বাংলাদেশে আসা ঠেকাতে গুরুত্ব দিতে বলেছে। নইলে সরকারের সব কর্মপ্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যাবে বলে সতর্ক করে দিয়েছে সংস্থা দুটি।
জানা গেছে, এদেশে আফ্রিকার নাগরিকরা জঙ্গি তত্পরতা ও ডলার জাল-জালিয়াতিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সমপ্রতি নাইজেরীয় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্তরায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের এক ছাত্রকে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতিপূর্বে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বিভিন্ন অপরাধে জড়িত বেশ কয়েকজন পশ্চিম আফ্রিকার নাগরিককে গ্রেফতার করেছে।
দেশের তিনটি বিমান বন্দর, ২টি নৌবন্দর ও ২০টি সীমান্ত পথ দিয়ে আক্রান্ত দেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা রয়েছে। তবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর দিয়ে আক্রান্ত দেশ থেকে যাত্রী বেশি আসে। গতকাল পর্যন্ত বিমান বন্দর দিয়ে ১৭০ জন যাত্রী আক্রান্ত দেশ থেকে আসে। তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিমান বন্দর ও বেনাপোল চেক পোস্টসহ অন্যান্য পথ দিয়ে আরো ৩০ জন দেশে ফিরেছে। তাদেরকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ২১ দিন পর্যন্ত থাকার পরামর্শ দেয়া হয়। শুক্রবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড়দের বিমান বন্দরে দীর্ঘ সময় ধরে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইবোলা মোকাবেলায় তাদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে বলেছে, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সংস্থার এক শ্রেণীর কর্মচারী-কর্মকর্তা আক্রান্ত দেশগুলোতে শুরুতে যথাযথ কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। লাইবেরিয়া, সিয়েরালিওন ও ঘানায় প্রথম যখন ইবোলা দেখা দিয়েছিল তখনই সুযোগ ছিল এগুলো সেখানেই মোকাবিলা করা, কিন্তু সেই সুযোগ নষ্ট হয়ে গেছে। শুরুতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিষয়টি গুরুত্ব দিলে এটি অতি দ্রুত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তো না।
রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, বিমানবন্দরসহ ২৫ স্থানে কঠোর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা রয়েছে। আক্রান্ত দেশ সমূহ থেকে আসা যাত্রীরা কোন অবস্থায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ব্যতীত দেশে আসতে পারবে না।
ইবোলার বিস্তারে হতাশ বিশ্বব্যাংক
প্রাণঘাতি ইবোলা মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী জোর প্রচারণা এবং প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু তারপরেও একে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। একারণে হতাশা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্ব ব্যাংক শুক্রবার আশংকা প্রকাশ করেছে যে, ইবোলা সংক্রমণ বন্ধে চলমান লড়াই সফল হবে না।
এদিকে জাতিসংঘ ইবোলা মহামারী রোধে আরো অর্থের আবেদন জানিয়েছে। এ ছাড়া ইবোলা সংক্রমণের কারণে বিশ্ব জুড়ে ভ্রমণ নিয়ে ভীতি বেড়ে চলছে। তবে সেনেগাল কিছুটা আশার আলো ছড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দেশটিকে ইবোলা মুক্ত ঘোষণা করেছে। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ইবোলা রোধ সংক্রান্ত কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য একজন ‘ইবোলা জারের’ নাম ঘোষণা করেছে।
এদিকে ওষুধ প্রস্তুতকারক গ্লাক্সোস্মিথক্লাইন বলেছেন, ২০১৬ সালের শেষ নাগাদের আগে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার উপযোগী ইবোলা ভ্যাক্সিন উত্পাদন করার সম্ভাবনা কম। বিশ্ব ব্যাংক প্রধান জিম ইয়ং কিম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘আমরা এ লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছি।’ তিনি এর জন্য ইবোলা মহামারী রোধের প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক সংহতির অভাবকে দায়ী করেছেন। তিনি প্যারিসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিছু কিছু দেশ কেবল তাদের নিজেদের সীমান্ত নিয়েই চিন্তিত।’ বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন, আগামী ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে ইবোলা সংক্রমণ হার সপ্তাহে ১০ হাজার ছুঁয়ে যেতে পারে।