সার্ক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজিস) অর্জনে অগ্রগতির দিক থেকে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। কিছু কিছু দিক থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়লেও সার্বিক দিক থেকে বাংলাদেশের অর্জন ভালো। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রথম অবস্থানে রয়েছে শ্রীলংকা। সার্ক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বিষয়ক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ সব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। রবিবার প্রতিবেদন উপস্থাপনের লক্ষ্যে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, পরিকল্পনা সচিব ভূঁইয়া সফিকুল ইসলাম এবং ইউএনডিপির ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর নিহোলাস বেরিশফোর্ড।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— ২০০৬ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ১৩তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে সার্কভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা সার্ক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করেন। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এতে চারটি ক্ষেত্রে ২২টি লক্ষ্যকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এ সব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি দ্বিতীয়। নবজাতক মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে শ্রীলংকা স্টার পারফরমার। দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ, তৃতীয় নেপাল। গড় আয়ু লাভের ক্ষেত্রে শ্রীলংকা স্টার পারফরমার, দ্বিতীয় বাংলাদেশ ও নেপাল, তৃতীয় অবস্থানে ভুটান। পাঁচ বছরের নিচের শিশু মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে শ্রীলংকা স্টার পারফরমার, বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে এবং তৃতীয় অবস্থানে নেপাল। মাতৃমৃত্যু হার কমানোর ক্ষেত্রে শ্রীলংকা স্টার পারফরমার, দ্বিতীয় অবস্থানে নেপাল এবং তৃতীয় ভুটান। স্যানিটেশন উন্নয়নের ক্ষেত্রে স্টার পারফরমার শ্রীলংকা, দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ এবং তৃতীয় অবস্থানে পাকিস্তান। ফারটিলিটি রেটে বাংলাদেশ স্টার পারফরমার, দ্বিতীয় অবস্থানে শ্রীলংকা ও ভুটান এবং তৃতীয় ভারত। নবজাতকের টিকাদানের ক্ষেত্রে শ্রীলংকা স্টার পারফরমার, বাংলাদেশ দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অবস্থানে ভুটান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ৬৬ শতাংশ ছিল কম ওজনের। ২০১১ সালে এসে এ হার ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি, হামের টিকা গ্রহণের হার বৃদ্ধি, ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টের বিস্তৃতি এবং খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধি এ সাফল্যের কারণ। এ ছাড়া, মাথাপিছু দৈনিক ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে— ১৯৯০ সাল থেকে দারিদ্র্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি মৌলিক চাহিদা ব্যয় পদ্ধতিতে পরিচালিত খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১০-এ দেখা গেছে— ১৯৯১-৯২ সালে জাতীয় মাথাগুনতি দারিদ্র্য হার ছিল ৫৬ দশমিক সাত শতাংশ, যা ২০১০ সালে কমে হয়েছে ৩১ দশমিক পাঁচ শতাংশ। চরম দারিদ্র্য একই সময়ে ৪১ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা বর্তমানে আরো কমেছে। জিডিপিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কারণে দারিদ্র্য হার হ্রাস পেয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের পেছনে কাজ করেছে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান, প্রত্যাশিত আয়ু বৃদ্ধি, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, অবকাঠামো ও টেলিকমিউনিকেশনে উন্নতি, অভ্যন্তরীণ মাইগ্রেশন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে জোর প্রদান ইত্যাদি।
এসডিজিস অর্জন প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, সার্ক অঞ্চলের দেশগুলো চেষ্টা করছে এ অঞ্চলের দারিদ্র্য কমানোর জন্য। বাংলাদেশ এমডিজি অর্জনে সফল হয়েছে। এরই মধ্যে গত দুই দশকে দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। সামাজিক উন্নয়নও অনেক ভালো হয়েছে। আশা করছি— সামনে এসডিজি অর্জনেও বাংলাদেশ সফলতার স্বাক্ষর রাখবে। তিনি আরও বলেন— শেখ হাসিনার সরকার ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ গড়তে চায়। সেই লক্ষ্যে গুণগত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করা আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন— সার্ক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শ্রীলংকা এগিয়েছে। কারণ, তাদের বাজেটে শিক্ষা ও স্থাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল অনেক বেশি। প্রতিবেদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন— এ প্রতিবেদনটি সার্ক সচিবালয়ে পাঠানো হবে। তারপর সমন্বিত আকারে একটি প্রতিবেদন সব দেশে প্রকাশ করা হবে।