কৌশল নির্ধারণ নিয়ে দ্বিধায় বিএনপি নেতারা

ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটিকে কেন্দ  করে সৃষ্ট সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ মিটছে না। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নির্দেশনায় দলটির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির একজন সদস্যসহ কয়েকজন নেতা বিক্ষুব্ধ নেতাদের ক্ষোভ প্রশমনে উদ্যোগ নিয়েছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা নিজেরা দুই দফা বৈঠক করেছেন। কিন্তু ঠিক কোন উপায়ে বিদ্রোহ প্রশমন করা হবে এবং বিক্ষুব্ধদের দাবি মিটিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করা হবে, সে বিষয়ে একমত হতে পারছেন না তারা। দায়িত্বপ্রাপ্তদের একটি অংশ চাইছেন, বিদ্রোহী কয়েকজন নেতাকে ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে পদায়ন এবং বাকি কয়েকজনকে বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলে পদায়নের ব্যবস্থা করা। আবার কয়েকজন বিদ্রোহীদের বহিষ্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। এছাড়া বিদ্রোহে ইন্ধন ও সহযোগিতা দিচ্ছেন এমন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোকে শনাক্ত করে বিরোধ নিরসনেরও চেষ্টা করছেন তারা। কিন্তু দোদুল্যমনতার কারণে গতকাল পর্যন্ত প্রকাশ্য কোন ফলাফল দেখা যায়নি। অন্যদিকে বিদ্রোহীরা                 নতুন কমিটি স্থগিত এবং বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও সহ-সম্পাদকের অব্যাহতির দাবিতে অটল থাকলেও তারা সম্মানজনক সমাধান চাইছেন। দাবি না মানা হলে আজ থেকে তারা আবারো রাস্তায় নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

গত ১৪ অক্টোবর রাজিব আহসানকে সভাপতি ও আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করে ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এরপর থেকেই বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেন পদবঞ্চিত ও পছন্দমত পদ না পাওয়া প্রার্থীরা। গত শনি ও রবিবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে পদপ্রাপ্ত ও পদবঞ্চিতদের দুই পক্ষ।
বিএনপি ও ছাত্রদলের একাধিক সূত্র জানায়, রবিবার নয়াপল্টনে ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষ-ভাংচুরের পর বিদ্রোহ মেটাতে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন নেতাকে দায়িত্ব দেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। কিন্তু তারা রবিবার সংঘর্ষ বন্ধ করতে ব্যর্থ হন। এ বিষয়ে মীমাংসার উপায় নির্ধারণ করতে রবিবার রাতেই খালেদা জিয়া গুলশানে নিজ কার্যালয়ে মহাসচিব, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগর কমিটির আহবায়ক মির্জা আব্বাস, রুহুল কবির রিজভী, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, সহ-সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এবং ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে মহাসচিব ও মির্জা আব্বাসকে কোন্দল মেটানোর দায়িত্ব দেয়া হয়। অন্যদের সহযোগিতা করার নির্দেশনা দেয়া হয়।
এরপর গতকাল বিকালে নয়াপল্টনে দলীয় অফিসে প্রায় পৌনে একঘন্টা বৈঠক করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। এতে বিএনপির আরো তিন জন নেতা অংশ নেন। বৈঠক সূত্র জানায়, ছাত্রদলের কোন্দল মেটাতে সবাই একমত হলেও এর উপায় নিয়ে বৈঠকে একমত হওয়া যায়নি। একটি অংশ বিদ্রোহীদের বহিষ্কারের পক্ষে মত দেয়। আরেকটি অংশ বিদ্রোহীদের বয়স ও দলে অবদান অনুযায়ী পদায়ন করার পরামর্শ দেন। এছাড়া বিদ্রোহের পেছনে সরকারের একটি অংশের ইন্ধন এবং বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতার ইন্ধনের বিষয়েও আলোচনা হয়। এজন্য নেতারা বিভিন্ন পক্ষে যোগাযোগের কাজ নিজেরা ভাগ করে নেন। বৈঠকশেষে মির্জা আব্বাস সাংবাদিকদের বলেন, ছাত্রদল একটি বড় সংগঠন। এতে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা রয়েছে। নানা রকম সমস্যাও থাকে। তবে তার সমাধানও হয়ে যাবে।
এদিকে গতকাল বিকালে তিন ঘন্টারও বেশি সময় ধরে রাজধানীতে একটি বেসরকারি অফিসে বৈঠক করেন বিদ্রোহী নেতারা। বৈঠকের একপর্যায়ে তারা মহাসচিবের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করেন। মহাসচিব তাদেরকে শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে সকলের জন্য সম্মানজনক ও উপকারী একটি সমাধান করা হবে বলে আশ্বাস দেন। বিক্ষুব্ধ অংশের নেতার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চাইলে তিনি তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন। এরপর গত রাতের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আজ মঙ্গলবার থেকে তারা আবারো নয়াপল্টনে অবস্থান নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন বলে জানান একাধিক পদবঞ্চিত নেতা।
বিদ্রোহের কারণ
জানা যায়, ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ব্যাচমেট এবং তাদের কনিষ্ঠ কয়েকজন ‘যোগ্যনেতাকে’ পদ দেয়া হয়নি। অথচ বয়সের কারণে অনেকে বাদ পড়েছেন বলে দাবি করেছেন বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক। এ বাদপড়া নেতারা সংগঠনে শক্তিশালী। এদের মধ্যে কয়েকজন হলেন তরুণ দে, শহীদুল্লাহ ইমরান, ওবায়দুল হক নাসির, মশিউর রহমান মিশু, ফেরদৌস আহমেদ মুন্না, তরিকুল ইসলাম টিটু, মনিরুল ইসলাম সোহাগ, নূরুজ্জামান মুকিত লিংকন, শামসুজ্জোহা সুমন, হাবিবুর রহমান সুমন, রাকিবুল ইসলাম রয়েল, আশরাফ বাবু, আবদুল মান্নান ফরহাদ। এ নেতাদের সাথে বাদপড়া জ্যেষ্ঠ নেতা আবু সাঈদ, আনিসুর রহমান তালুকদার খোকনসহ কয়েকজন যোগ দেন। এছাড়া কমিটিতে পদপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকারসহ কয়েকজন নেতাও বিদ্রোহ করেন। তারা মূলত দলে অবদান মূল্যায়ন না হওয়া ও প্রটোকল অনুযায়ী পদ না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন।
বিএনপি ও ছাত্রদলের বিভিন্ন সূত্র জানায়, বিক্ষুব্ধদের এ ক্ষোভকে পুঁজি করেছেন বিএনপিতে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করার চেষ্টারত কয়েকজন নেতা। এদের মধ্যে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য, তিন জন যুগ্ম মহাসচিব, সম্পাদক পদের দুই নেতা, ছাত্রদলের সাবেক চারজন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। একইসাথে সরকারের একটি অংশেরও এতে ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ প্রসঙ্গে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান বলেন, প্রতিবারই নতুন কমিটি হওয়ার পর কিছু ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা যায়। আশা করি সবকিছুর সঠিক সমাধান হবে। সংঘর্ষে লিপ্ত হলে নিজেদেরই শক্তি ক্ষয় হবে। তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে দলকে এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান।

এদিকে গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপি অফিসের সামনে বিদ্রোহীদের কাউকে দেখা যায়নি। সরব অবস্থান ছিল পদপ্রাপ্ত নেতা ও তাদের সমর্থকদের। কোন্দলের রেশ পড়েছে ছাত্রদলের ওয়েবসাইটেও। দুইপক্ষের সংঘর্ষে স্বার্থান্ধতার অভিযোগ এনে ও দ্বন্দ্ব মেটানোর আহ্বান জানিয়ে ওয়েবসাইটটি হ্যাক করা হয়েছে। এছাড়া রবিবার সংঘর্ষে আহতদের দেখতে রাজধানীর দুইটি হাসপাতালে যান বিএনপি মহাসচিবসহ কয়েকজন নেতা।