সক্ষমতার চেয়ে ধীরে এগুচ্ছে দেশ, প্রবৃদ্ধি হবে ৬.২ শতাংশ

২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর চলতি অর্থবছরে এ হার ৬ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি একই সঙ্গে উল্লেখ করেছে, দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানব উন্নয়নে ভালো করলেও অর্থনীতির যে সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশ তার সবটুকু ব্যবহার করতে পারছে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সর্বশেষ বিশ্লেষণে এসব কথা বলেছে বিশ্বব্যাংক। গতকাল সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিশ্লেষণধর্মী এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। এ সময় কান্ট্রি ডিরেক্টর ইয়োহানেস জাটও উপস্থিত ছিলেন।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। তবে সক্ষমতার চেয়ে কম গতিতে। বিদ্যুত্ ও গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। এক বছর আগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে যে সময় লাগতো, এখন তার চেয়ে বেশি সময় লাগে। 
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত এক দশক ধরে দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানব উন্নয়নে ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। বিশেষ করে কৃষি এবং প্রবাসীদের আয়ের ওপর ভর করে প্রতিবছর দারিদ্র্য কমেছে গড়ে ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ হারে। গত দশকের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, এবছর দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে। ড. জাহিদ বলেন, বিদেশে শ্রমশক্তির রপ্তানি বৃদ্ধি বেকার সমস্যা সমাধানে অবদান রেখেছে। বর্তমানে ২২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে। এটি খুবই সন্তোষজনক। এই রিজার্ভ দিয়ে ছয় মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তিনি বলেন, এ কথা ঠিক যে - বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এসেছে। তবে অনিশ্চয়তা কাটেনি। রাজনৈতিক পরিস্থিতির এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে প্রভাব ফেললে অর্থনীতি ফের নেতিবাচক ধারায় যাবে। সেক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, চাপে পড়তে পারে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। সরকারি ব্যাংকগুলোর দুরবস্থাও আর্থিক খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিতে পারে। তৈরি পোশাক কারখানার সমস্যা ইউরোপের বাজারে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই শিল্পের পরিবেশ উন্নত করতে নেয়া পদক্ষপগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। অর্থবছর শেষে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। এসময় খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়বে। তবে খাদ্য বহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি কমতে পারে।
প্রতিবেদনে অবকাঠামো খাতের চারটি প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো হলো - পদ্মা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ডাবল ট্র্যাক স্থাপন এবং বিবিয়ানায় গ্যাস ভিত্তিক দুইটি বড় বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন।

৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হলেও ড. জাহিদ হোসেন একে সন্তোষজনক আখ্যায়িত করে বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ছাড়া সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে নিয়ে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ আশানুরূপ হচ্ছে না। বর্তমানে বিনিয়োগ জিডিপির ২৮ শতাংশ। একে ৩৪ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। রাজস্ব প্রশাসনে সংস্কারের পরামর্শ দিয়ে প্রতিবেদনে নতুন ভ্যাট আইনের প্রশংসা করা হয়। জাহিদ হোসেন বলেন, আগের ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় অনেক ফাঁক-ফোকর ছিল। সে তুলনায় নতুন আইন অনেক বেশি স্বচ্ছ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ বাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগে গরীব মানুষের গড় আয় বেড়েছে। তবে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সরকারের সামনে রয়ে গেছে। সাংবাদিক সম্মেলনে কান্ট্রি ডিরেক্টর ইয়োহানেস জাট বলেন, বাংলাদেশ সরকারকে বাজেট সহায়তা দেয়ার বিষয় নিয়ে বিশ্বব্যাংক এবং সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছে। ইবোলা ভাইরাস নিয়য়ন্ত্রণসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্বব্যাংকের সহায়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।