ট্রাম্প-কিম দ্বিতীয় বৈঠক

আস্থার সংকট কাটানোই মূল লক্ষ্য

আগামী বুধ ও বৃহস্পতিবার ভিয়েতনামের হ্যানয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বৈঠকে বসতে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন। এই বৈঠকে যোগ দিতে গত শনিবারই ট্রেনযোগে যাত্রা করেছেন কিম। দুই নেতার এবারের বৈঠকে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ও আস্থা অর্জনই হবে মূল লক্ষ্য।

ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই উত্তর কোরিয়াকে নানা ধরনের হুমকি দিয়ে আসছিলেন। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে উত্তর কোরিয়াও হুমকি দিচ্ছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের শেষদিক থেকে দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। গত বছরের ১২ জুন প্রথমবারের মতো সিঙ্গাপুরের সান্তোসা দ্বীপের বিলাসবহুল ক্যাপেলা হোটেলে ঐতিহাসিক বৈঠকে বসেন এই দুই নেতা। দুই দফায় প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বৈঠক করেন তারা। বৈঠকে কিম কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার অঙ্গীকার করেন। বিনিময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

তবে বিভিন্ন মার্কিন গোয়েন্দারা বলেছেন যে, উত্তর কোরিয়া তাদের প্রতিশ্রুতি মানছে না। সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি তদন্ত কমিটি জানায়, ট্রাম্পকে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও পরমাণু কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে উত্তর কোরিয়া। তারা এই অস্ত্রকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত জানুয়ারিতে মার্কিন সিনেটের গোয়েন্দা কমিটির শুনানিতে মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স এর পরিচালক ড্যান কোটস উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের ঘোষণা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন যে, গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন কিমের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তবে এই খবর নাকচ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, কিমের সঙ্গে তার চমত্কার সম্পর্ক রয়েছে এবং কোরীয় উপদ্বীপ পরমাণু অস্ত্র মুক্ত হবে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি ইউনিয়ন অব দ্য স্টেট ভাষণে ট্রাম্প এ বিষয়ে বলেন, কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। গত ১৫ মাসে একটিও ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়নি উত্তর কোরিয়া। যদি আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হতাম তাহলে হয়তো এখন দেশটির সঙ্গে একটি বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তো যুক্তরাষ্ট্র। তবে এখনো অনেক কাজ করতে হবে। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর কোরিয়া বিষয়ক দূত স্টিফেন বাইগুন পিয়ংইয়ং যান। দ্বিতীয় বৈঠকের আগে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের রোডম্যাপ তৈরি করতে এই সফর করেন তিনি।

প্রথমদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ইস্যুতে কড়া অবস্থানে থাকলেও সম্প্রতি তার অবস্থান বদলাতে শুরু করেছেন। চলতি মাসের মাঝামাঝি হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে দেওয়া এক বক্তৃতায় বলেন, আমাদের তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। আমরা চাই অস্ত্রের পরীক্ষা বন্ধ হোক।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএন’কে বলেন, এবারের বৈঠকে ট্রাম্প চারটি বিষয় গুরুত্ব দেবেন। এগুলো হলো, দুই দেশ নতুনভাবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগ নেওয়া, কোরীয় উপদ্বীপে স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ শাসন ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে যৌথভাবে কাজ করা, কোরীয় উপদ্বীপকে সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং কোরীয় যুদ্ধের সময় নিহত মার্কিন সেনাদের দেহাবশেষ ফেরত দেওয়া। তবে গুরুত্বের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের বিভিন্ন ইতিবাচক দিকগুলো কিমের সামনে তুলে ধরবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, উত্তর কোরিয়া নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিনা আমি নিশ্চিত নই। তবে আমরা বিশ্বাস করি এক্ষেত্রে ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।

সাইরাকুস ইউনিভার্সিটির প্র্যাকটিস, পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এন্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের প্রফেসর ভাইস অ্যাডমিরাল রবার্ট বি. মুরেত্ত ফক্স নিউজকে বলেন, এবারের বৈঠকে কোরীয় উপদ্বীপে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ হবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। প্রথম বৈঠকের পর কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। তবে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা অনুযায়ী অগ্রগতি হয়নি। নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি এর একটি কেন্দ্রের সিনিয়র ফেলো দুয়েন কিম ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করবে কিনা সেটা আগামী বৈঠকেই নির্দিষ্ট হবে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কতটা ছাড় দিতে রাজি হবে সেটাও জানা যাবে। তবে এক্ষেত্রে একটি সমস্যা হলো, উত্তর কোরীয় নেতা ও আলোচকদের মনে কি চলছে সেটা বুঝতে পারা হবে মার্কিন আলোচকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের বৈঠক ও আলোচনায় পিয়ংইয়ং কখনোই বিশ্বস্ত পার্টনারের পরিচয় দেয়নি। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পও একজন ‘আনপ্রেডিকটেবল ম্যান’। যার ওপর আস্থা রাখাও কঠিন। যে কারণে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ইস্যুতে এখনই অতি আশাবাদী হওয়ার তেমন কিছু নেই।