বিশ্বব্যাংক ও এডিবির প্রভাব কমাতে গঠিত হলো এশীয় ইনফ্রাষ্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)। গতকাল শুক্রবার চীনের রাজধানী বেইজিং এ আনুষ্ঠানিকভাবে ৫ বিলিয়ন ডলার তহবিল নিয়ে এ ব্যাংক গঠনে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে চীন, ভারত ও বাংলাদেশসহ ২১টি দেশ। কিন্তু মার্কিন চাপে এ ব্যাংকে যোগদান থেকে বিরত রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়া। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরি অস্ট্রেলিয়াকে এ ব্যাংকে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখতে চাপ দিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি এ্যবোটকে ব্যক্তিগতভাবে তিনি এ ব্যাংকে যোগদান থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম কূটনৈতিক সহযোগী জোটের সদস্য দক্ষিণ কোরিয়া পূর্বে এ ব্যাংকে যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত তা করেনি। মার্কিন প্রভাব কমাতে চীনের নেয়া পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে দক্ষিণ কোরিয়া। নতুন সরকার চীনের প্রস্তাব বিবেচনা করার জন্য যথেষ্ট সময় পায়নি, এমন কারণ দেখিয়ে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে অনুপস্থিত ছিলো ইন্দোনেশিয়া। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জন প্যাসকি বলেছেন, এশিয়ার অবকাঠামো উন্নয়নে এ ব্যাংক গঠনে আইডিয়াকে স্বাগত জানাচ্ছি কিন্তু আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করবো যাতে এতে আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত হয়। তবে শুরুতেই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ব্যাংক গঠনে ইতিপূর্বে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম স্বাগত জানালেও অভিন্ন উদ্দেশ্য এবং এশিয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার কারণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রেসিডেন্ট তাকিহিকো নাকাওয়া স্বাগত জানাননি।
উদ্বোধনের পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং বলেছেন, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ভালো দিকগুলো তারা অনুসরণ করবে। এর সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ও উদ্বিগ্ন নন তিনি। গতকাল স্বাক্ষরিত সমঝোতা অনুযায়ী আগামী বছরের মধ্যে ব্যাংকটি পূর্ণাঙ্গ ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে যার মূলধন হবে ১০০ বিলিয়ন ডলার। এর সদর দফতর হবে বেইজিংএ। প্রাথমিক অবস্থায় বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সড়কের উন্নয়নসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে যোগাযোগে মনযোগী হবে সংস্থাটি। গত বছর বেইজিং এ আইআইবি গঠনের প্রস্তাব দিলে দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশও আগ্রহ দেখায়। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তাদের অনেকেই বেইজিংয়ের অনুষ্ঠানে ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বড় অর্থনীতির দেশ চীনের নেতৃত্বে গঠিত এ ব্যাংকে চীনের অর্ধেক শেয়ার থাকছে। চীনের অর্থমন্ত্রী লো জিইউ, বাংলাদেশের অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম. এ মান্নানসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তবে এ বৈঠকে অপ্রত্যাশিত ভাবে অনুপস্থিত ছিলো চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ জাপান। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওয়াশিংটনের জোর কূটনীতিক তত্পরতাই এর মূল কারণ। অনেকেই ওয়াশিংটন বা টোকিওর বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না। অনেকে অবশ্য এআইআইবির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে পরবর্তীতে এর সদস্য হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
এশিয়ার নতুন এ ব্যাংকে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া উন্নত দেশ, তাদের এ ধরনের ব্যাংকে যোগদানের প্রয়োজনীয়তা নাও থাকতে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া উন্নত দেশ হলেও তারা তা কৌশলগত কারণে স্বীকার করে না। বাংলাদেশের অবকাঠামোর উন্নয়নের যে চাহিদা রয়েছে তাতে এ ধরনের অর্থায়নের উেসর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
মূলত বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মাধ্যমে এশিয়ায় পশ্চিমাদের প্রভাব হ্রাস করতেই এ ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেয় চীন। বিশ্বব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী প্রতিবছর উন্নয়নশীল দেশে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজন হচ্ছে প্রায় এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ খাতে বিশ্বব্যাংক গত বছর ৬০ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। বেসরকারি খাতসহ এর মোট পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রকৃত চাহিদার অনেক কম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সমপ্রতি জিডিপি’র আকারের দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই চীন বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জাপানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। তার পরেও যুক্তরাষ্ট্র কিম্বা জাপানের চেয়ে বিশ্বব্যাংক কিম্বা আইএমএফ এ নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে পিছিয়ে রয়েছে চীন।
বিশ্বব্যাংকের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ভোট দেয়ার ক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্যের থেকেও কম ক্ষমতা রয়েছে চীনের। বলতে গেলে দ্বিতীয় সারির ভোটার হওয়ায় বিশ্বব্যাংকে চীনের ক্ষমতা অনেক কম। অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে চীন মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জাপানের রয়েছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ শেয়ার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) চীনের জন্য রয়েছে ৪ শতাংশ কোটা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ১৮ ভাগ কোটা।
সবমিলিয়ে বড় অর্থনীতির দেশ হওয়ার কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে যাচ্ছে চীন।