অসংক্রামক ব্যাধি (এনসিডি) প্রতিরোধ কর্মসূচির প্রায় ২৫ কোটি টাকার চিকিত্সা সামগ্রীর হদিস মিলছে না। কেন্দ্রীয় ঔষধাগার কর্তৃপক্ষ কাগজপত্র দেখিয়ে বলছে, এসব চিকিত্সা সামগ্রী দেশের ৪৮৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়েছে। সে সূত্র ধরে কয়েকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরেজমিনে গিয়ে এ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করা হলে তারা সদুত্তর দিতে পারেনি। এখন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছে, তাহলে এই ২৫ কোটি টাকার চিকিত্সা সামগ্রী গেলো কোথায়?
অসংক্রামক ব্যাধি হলো ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, উচ্চ রক্তচাপ, হূদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, অ্যাজমাসহ শ্বাসতন্ত্রের রোগ, কিডনি, নাক,কান ও গলার নানা প্রদাহ। এসব রোগ কেন হয় তা সকলেই জানে। একটু সচেতন হলেই মানুষ এসব রোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। আর এ কারণেই সরকার শহর থেকে গ্রাম পর্যায়ে এনসিডি কার্যক্রম ব্যাপকভাবে শুরু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে।
এরই অংশ হিসাবে ২০১১ সালে অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর জন্য আর্থিক বরাদ্দ বাড়ানোরও ঘোষণা দেন তিনি। এর পরপরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতর এনসিডি কার্যক্রম বাস্তবায়নে গ্রহণ করে চার বছর মেয়াদী একটি প্রকল্প। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০১১ সালের মার্চ থেকে ২০১৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। প্রকল্পের পেছনে এ চার বছর সরকার প্রায় ৫১৯ কোটি বরাদ্দ দেয়। পরে নানা কারণে সরকার প্রকল্পের মেয়াদ আগামী বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন লাইন ডাইরেক্টরের উপর এই এনসিডি কার্যক্রম বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। ২-১২-২০১৩ ও ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরে ২৫ কোটি টাকার ওষুধ সামগ্রী ওষুধাগার ক্রয় করেছেন।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৪৮৮ টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনসিডি কর্নার চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ডাক্তার, নার্স ও টেকনেশিয়ানদের ওই কর্নারে বসে রোগীদের চিকিত্সা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। আগত রোগীদের চিকিত্সা সেবা দিতে ডায়াবেটিস পরীক্ষা যন্ত্র, ওজন ও উচ্চতা মাপার যন্ত্র, ইসিজি মেশিন, ব্লাড প্রেসার মাপার মেশিনসহ রোগ পরীক্ষার জন্য নানা যন্ত্রপাতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কাগজে কলমে বলা হচ্ছে, আধুনিক চিকিত্সা সামগ্রী, এন্টিবায়োটিকসহ ৩১ ধরনের উন্নতমানের ওষুধ প্রদান করা হয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
সরকার যে এনসিডি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সাধারণ রোগীতো দূরের কথা এটা জানেইনা অনেক চিকিত্সক,নার্স ও টেকনেশিয়ান। এমনকি উপজেলা ও জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাও এ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন না। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খোলা হয়নি এনসিডি কর্নার। কয়েকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টোর কিপারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এনসিডি কর্মসূচির নামে চিকিত্সা সামগ্রীর প্রদানের বিষয়টি তাদের জানা নেই।
স্বাস্থ্য খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারাও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে গিয়ে এনসিডি কর্মসূচির বেহাল দশা দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অনেক বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ও সিভিল সার্জনের কাছে যখন এই কর্মসূচির সফলতা সর্ম্পকে জানতে চাওয়া হয়েছে তারা কিছুই বলতে পারেননি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, এনসিডি প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন ও জনগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতে যা যা করা দরকার সবই সরকার করছে। রোগী ঠিকমত সার্ভিস পাচ্ছেন কিনা তা দেখার দায়িত্ব বিভাগীয় পরিচালক, সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধানদের। এত বিপুল সংখ্যক ওষুধ সামগ্রী রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত সরকারিভাবে সরবরাহ করার নজীর অতীতে নেই। কিন্তু এই ওষুধ কোথায় কিভাবে ব্যবহার হচ্ছে তা ওই কর্মকর্তারা বলতে পারেন না। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন দেশ সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। বাংলাদেশও সংক্রামক ব্যাধি শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু অসংক্রামক ব্যাধি শতচেষ্টা করেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বিশ্বে যত রোগী মারা যাচ্ছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী মারা পড়ছে অসংক্রামক ব্যাধিতে। বাংলাদেশেও একই অবস্থা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের এনসিডি প্রোগ্রামের লাইন ডাইরেক্টর অধ্যাপক ডাঃ আমিরুল হাসান বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নারে শতাধিক রকমের ওষুধ সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। এগুলো দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের জন্য। যাতে তাদের বাইরে থেকে কোন কিনতে না হয়। তিনি বলেন, তার দায়িত্ব নেয়ার পর কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নে ৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পাইলট প্রোগ্রামের আওতায় আনেনে। এগুলো হলো রংপুরের পীরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জে কাজীপুর, সিলেট জৈন্তাপুর ও চাঁদপুরের মতলব উত্তর।
গত মঙ্গলবার ইত্তেফাকের এ প্রতিনিধি সিলেট প্রতিনিধি হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের কার্যক্রম সরেজমিনে দেখতে যান। ঐসময় এনসিডি প্রোগ্রামের লাইন ডাইরেক্টর অধ্যাপক ডাঃ আমিরুল হাসান উপস্থিত ছিলেন। যন্ত্রপাতি ওষুধ সামগ্রী সম্পর্কে জনতে চাইলে জৈন্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্টোর কিপার সাব্বির আহমদ কিছু বলতে পারেননি। তিনি বলেন, এ ধরনের ওষুধ সামগ্রী তিনি গ্রহণ করছেন কিনা তার মনে পড়ে না। তবে আড়াই মাস আগে কিছু বাক্স আসছে তা স্টোর রয়েছে। ডাইরেক্টরের উপস্থিতিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঐগুলো কেন্দ্রীয় ওষুধাগার থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। সিভিল সার্জন অফিসের স্টোর কিপার অশোক রায় একই ধরনের মতামত দেন।
সিলেট সিভিল সার্জন ডাঃ আজহারুল ইসলাম এনসিডি প্রোগ্রাম সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না বলে জানান। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক এ কার্যক্রম দেখতে সেখানে উপস্থিত তাও তিনি জানেন না। জৈন্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রধান ডাঃ রথীন্দ্র চন্দ্র দেব জানান, তিনি ইতিমধ্যে আলাদা এনসিডি কর্নার চালু করেছেন। সরবরাহকৃত ওষুধ সামগ্রী সম্পর্কে তার জানা নেই।
অধ্যাপক ডাঃ আমিরুল হাসান এনসিডি প্রোগ্রাম ও সরবরাহকৃত ওষুধ সামগ্রী সম্পর্কে স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দেখে বিস্মিত হন। ওই সময় জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এ অব্যবস্থাপনা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তারা ইত্তেফাকের সাংবাদিকদের জানান, সরকার ওষুধ সামগ্রীসহ চিকিত্সা সেবা প্রদানে সবকিছু বিনামূল্যে দিচ্ছেন। যা রোগী পাচ্ছেন না। এটার জন্য সরকার দায়ী নন। স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসন এ অব্যবস্থাপনা এর জন্য দায়ী। সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনসিডি প্রোগ্রাম বাস্তবায়নে একই অবস্থার কথা স্বীকার করে শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, বিভাগীয় পরিচালক ও সিভিল সার্জনরা নিয়োগ বদলি ও কেনাকাটা বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। এনসিডির মত গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম বাস্তবায়নে তদারকি না করার এ করুন অবস্থা।
সম্প্রতি এ প্রতিনিধি নিউইয়র্কের বাংলাদেশি চিকিত্সক ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে আলাপ করলে তারা তারা জানান, বাংলাদেশ সরকারের উপজেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বিনামূল্যে ওষুধ সামগ্রী সরবরাহ প্রশংসনীয় একটি কাজ।