আগাম সংসদ নির্বাচনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আসছে জানুয়ারিতে আন্দোলন করার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। তবে ধাপে-ধাপে বড় কর্মসূচির দিকে না এগিয়ে স্বল্প সময়েরই মধ্যেই আন্দোলনের সমাপ্তি টানতে চায় দলটি। সেক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ দিনের টানা কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনে সফলতা আনার লক্ষ্য নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। বিএনপির বিভিন্ন স্তরের কয়েক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড় জোর এক মাস আন্দোলনের পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। যা হবার এই সময়ের মধ্যেই হবে-এরকম মনোভাব নিয়েই কাজ চলছে। তবে যতদূর সম্ভব সহিংসতা এড়িয়ে আন্দোলনে জন-সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে বলে জানা গেছে।
বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে না বললেও কয়েক মাসের মধ্যেই বৃহত্তর আন্দোলনের ইঙ্গিত দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, ‘আমাদের চেয়ারপারসন (বেগম খালেদা জিয়া) বলেছেন, সময়মতো আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হবে। যে কর্মসূচির মাধ্যমে বর্তমান অনৈতিক সরকার বিদায় নিয়ে নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে।’ তিনি জানান, চলমান কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন জেলায় ২০ দলের জনসভা ও গণসংযোগের পরেই আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হবে।
সূত্র মতে, আগামী বছরের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বাধ্য করতে চায় বিএনপি। এর পাশাপাশি আরও কয়েকটি কারণেও আন্দোলনের জন্য জানুয়ারিকেই ‘উপযুক্ত’ ও ‘কৌশলী’ সময় বলে মনে করছে দলটির হাইকমান্ড। বেগম খালেদা জিয়াসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের অনেকের বিরুদ্ধেই চলমান মামলাসমূহের রায় ঘোষণার সময় হওয়ার আগেই আন্দোলনের মাধ্যমে জনদৃষ্টি ভিন্নদিকে নিয়ে যাওয়ার কৌশল রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শীর্ষ নেতাদেরসহ অন্য নেতা-কর্মীদের দ্রুত হয়ে জেলে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হবে বলেও মনে করা হচ্ছে। এছাড়া বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটে ভাঙ্গন সৃষ্টির জন্য সরকার চেষ্টা করছে বলে বিএনপি যে অভিযোগ করছে, সেটিও যেন বাস্তবায়ন হতে না পারে। জানুয়ারিতে আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনার এটিও অন্যতম কারণ।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করছি, জিয়া চ্যারিটেবল ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম জিয়াকে জেলে নেয়া হতে পারে। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলমান। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ শীর্ষ ও কেন্দ ীয় নেতাদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধেই ইতোমধ্যে মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের শত শত মামলায় মাঠ নেতা-কর্মীরা জেলের দুয়ারে। এজন্য এসব মামলার বিচার কাজের সময়সীমা মাথায় রেখেই আন্দোলনের ছক তৈরি হচ্ছে।’ উল্লেখ্য, নিজের জেলে যাওয়ার আশঙ্কা খালেদা জিয়া নিজেও সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন। দলীয় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘সরকার আমাকে জেলে নিতে চায়। কিন্তু আমাকে জেলে নেয়ার পরিণতি কী হবে, সরকার কী সেটি ভেবে দেখেছে? এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। আমার কোনো ভয় নেই, আমার দল আছে, আমাদের সঙ্গে জনগণ আছে।’
জানা গেছে, পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনপূর্ব আন্দোলনের মতো এবারও যেন ফলাফল ‘শূন্য’ না হয়, জানুয়ারির সম্ভাব্য আন্দোলন পরিকল্পনায় সেটিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আন্দোলনে সফলতা পেতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে ঢাকা মহানগরকে। কারণ দলটির নীতিনির্ধারকদের দৃঢ়বিশ্বাস, ঢাকা মহানগরীতে কার্যকর আন্দোলন না হওয়ায় পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। এবার যেন সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য ঢাকা মহানগর বিএনপির প্রতিটি থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের কাঠামো নতুন করে গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম, কমিটিতে এরকম নেতাদেরই অগ্রাধিকার দেয়া হবে। পাশাপাশি দলের অঙ্গ-সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনগুলোর ঢাকা মহানগরের কমিটিগুলোকেও চাঙ্গা করার চেষ্টা চলছে। আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা হওয়ার পর ঢাকা মহানগরের প্রতিটি স্তরের নেতা-কর্মীদের মাঠে উপস্থিতি নিশ্চিত করতেও বিএনপির হাইকমান্ড বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করবে। কর্মসূচিতে কারা অংশ নিচ্ছেন, কারা নিচ্ছেন না-গোপন সূত্রে এসব তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। ঢাকার পাশাপাশি জেলা-উপজেলার নেতা-কর্মীরাও যেন পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের আন্দোলনের মতো আরেক দফা মাঠে নামেন, সেজন্য তাদেরও বিভিন্ন ভাবে তাগিদ ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক আব্দুল আউয়াল মিন্টু ইত্তেফাককে জানান, সহসাই ঢাকা মহানগর কমিটির থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিট কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে। যারা যোগ্য, দলের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তাদেরকেই কমিটিতে স্থান দেয়ার বিষয়ে ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস ও সদস্য সচিব হাবীব-উন নবী খান সোহেলসহ তারা আলোচনা করেছেন বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, ঢাকায় আন্দোলন না হওয়ার কারণেই পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি বলে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন খালেদা জিয়া। বৃহস্পতিবার নীলফামারিতে ২০ দলের জনসভায় তিনি বলেছেন, ‘ঢাকার কারণেই আমরা ব্যর্থ হয়েছি। তবে এবার আর ব্যর্থ হবো না। এবার ঢাকায়ও আন্দোলন হবে।’
সম্ভাব্য আন্দোলন প্রস্তুতির বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দলের চেয়ারপারসনের সাম্প্রতিক বক্তব্যসমূহেই আন্দোলনের বিষয়ে দিকনির্দেশনা রয়েছে। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, এবার আপনারা যে আচরণ করবেন, আমরাও একই ভাষায় পাল্টা জবাব দেবো। তার (খালেদা জিয়ার) কথার ভেতরেই ইঙ্গিত রয়েছে। তারপরেও আমি বলবো, আমরা সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছি। এখন দল গুছানোর কাজ চলছে। এরপরেই এই সরকারকে বিদায়ের লক্ষ্যে কঠিন কর্মসূচি দেয়া হবে।’