দেশের ২০ জন শিল্পপতি ও রাজনৈতিক নেতা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ (হুজি) ও জমিয়াতুল মুজাহেদীন অব বাংলাদেশকে (জেএমবি) নিয়মিত অর্থ সহায়তা দেয়। গোয়েন্দা সংস্থা ঐসকল শিল্পপতি ও রাজনৈতিক নেতাদের ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখছে। তাদেরকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। পাকিস্তানসহ কয়েকটি ইসলামী রাষ্ট্র থেকে হুন্ডির মাধ্যমে সংগঠন দুটির নামে কোটি কোটি টাকা এসেছে। এছাড়া বাংলাদেশের জাল নোট ব্যবসার পুরোটাই জেএমবি নিয়ন্ত্রণ করছে বলে গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে।
জেএমবির প্রধান শায়খ আবদুর রহমান ও শফিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ভেবেছিল জঙ্গিদের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। তাদের আর ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি নেই। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ে জঙ্গিদের কিছু অপতত্পরতা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে।
গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে বিভিন্ন সূত্রের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা পেয়ে জঙ্গি সংগঠনগুলো নিজে-দের ফের শক্তিশালী করে তুলেছে। সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় জঙ্গিরা শক্ত ঘাঁটি গড়েছে। মুর্শিদাবাদ হয়ে অস্ত্র ওই সকল ঘাঁটিতে আসছে। বর্ধমানে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে জেএমবির দুই সদস্যের মৃত্যুর পর এবং বাংলাদেশে হুজির প্রথম সারির কয়েকজন নেতা গ্রেফতার হলে বেরিয়ে আসে জঙ্গি সংগঠনগুলোর নিজেদের শক্তিশালী করার নানা তথ্য।
মাওলানা রফিক আহমেদ ওরফে সাজিদ এবং বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ওমর ওরফে ফয়জুল ওরফে রবিসহ হুজির চারজন সমপ্রতি ডিবির হাতে গ্রেফতার হয়। তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য ও পাকিস্তানে তৈরি সাব মেশিনগান উদ্ধার করা হয়। বোমা তৈরির দুটি ল্যাবরেটরিরও সন্ধান পায় গোয়েন্দা পুলিশ। গোয়েন্দাদের অনুসন্ধান ও গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে জঙ্গিরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল।
শেখ হাসিনার ওপর হামলা
ও হামলার প্রচেষ্টা
গত জুনে হুজির আধ্যাত্মিক নেতা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় গ্রেফতার মাওলানা আবু জাফর ওরফে আবু সাইদ শেখ প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। তিনি বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারে রয়েছেন। সেখানে বসেই তিনি শেখ হাসিনাকে হত্যার নির্দেশনা দেন মাওলানা রফিককে। গত আগস্ট মাসে শেখ হাসিনার ওপর জঙ্গি হামলা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা ও তার নিরাপত্তা জোরদার করার কারণে। এর আগে ২০০০ সালে হুজির কেন্দ্রীয় কমিটির সভায়ও শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য আলোচনা হয়। ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন মুফতি হান্নানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।
মুফতি হান্নানের নেতৃত্বে ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় শেখ হাসিনার সমাবেশ স্থান ও হেলিপ্যাডের কাছে ৭৬ কেজি ওজনের দুইটি শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখা হয়। শেখ হাসিনা সমাবেশে আসার আগেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ওই বোমা উদ্ধার করে। প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা।
কোটালিপাড়া মিশন ব্যর্থ হলে ২০০১ সালের ৩০ মে খুলনার রূপসা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করে হুজি। অনুষ্ঠান শুরুর তিনদিন আগে সেতুর কাছে রূপসা নদীতে দুইটি ইঞ্জিন চালিত নৌকাসহ ১৫ হুজি সদস্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। সেবারও তারা সফল হয়নি। হামলার জন্য ইঞ্জিন চালিত নৌকা দিয়ে হুজির ১৫ সদস্য রেকি করতে গিয়েছিল। সেখানে ছিলেন হুজির অন্যতম বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ মাসুম বিল্লাহ। পরে তিনি জামিনে বেরিয়ে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় অংশ নেয়। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সিলেটে শেখ হাসিনা নির্বাচনী জনসভায় গেলে হুজি তাকে হত্যা করার জন্য বোমা পুঁতে রাখে। কিন্তু হামলার আগেই জনসভার কাছে বোমা বিস্ফোরণে জঙ্গিদের দুই সদস্য নিহত হয়। সেবারও প্রাণে রক্ষা পান বঙ্গবন্ধু কন্যা। মুফতি হান্নান ও তার গুরু মাওলানা আবু সাইদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তারা এসব তথ্য জানিয়েছে।
কে এই মাওলানা আবু সাইদ
মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে আবু জাফর ওরফে বাচ্চু মৌলভীর বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার বারবাড়িয়া ইউনিয়নের লক্ষণপুর গ্রামে। তার পিতার নাম আব্দুল হাই। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। ছোট দুই ভাই আনিছুর ও মুক্তার দীর্ঘদিন ধরে কুয়েতে থাকে। বাচ্চু মৌলভীর মা আমেনা খাতুন জানায়, তার বড় ছেলে যাত্রাবাড়ী, টাঙ্গাইলের মধুপুর, চট্টগ্রামের হাটহাজারী এবং ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছে। বাচ্চু মৌলভী বিবাহিত। তার স্ত্রী রহিমা খাতুন তিন ছেলে সাদ, জিসান ও তাওসিরকে নিয়ে ঢাকার কোন এলাকায় বসবাস করে তা পরিবারের লোকজন জানে না। আবু সাঈদ লক্ষণপুর নূরানিয়া মাদ্রাসা নামে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ঢাকার উত্তরায় তার প্রতিষ্ঠিত একটি মাদ্রাসা তিনি গ্রেফতার হলে বন্ধ হয়ে যায়। আবু সাঈদ চারদলীয় জোট সরকারের আমলে নূরানী শিক্ষা বোর্ডের সদস্য ছিলেন। মাওলানা আবু সাঈদের প্রতিবেশী স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হোসেন বলেন, মাওলানা আবু সাঈদ আফগানিস্থানে যুদ্ধও করেছে। তিনি এলাকায় তেমন একটা আসে না।
ল্যাপটপ ও জিহাদী বইসহ হুজির আরেক সদস্য গ্রেফতার
র্যাব-৩ গত সোমবার রাতে খিলগাঁও গোড়ান শান্তিপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে হুজির সক্রিয় সদস্য মুফতি যোবায়ের আবদুল্লাহ ওরফে সাজেদ মোহাম্মদ ফয়েজ ওরফে খায়রুল হাসান ওরফে নয়নকে গ্রেফতার করে। তার কাছে একটি ল্যাপটপ ও অনেকগুলো জিহাদী বই পাওয়া গেছে। তিনি নিজেও জিহাদ নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় বই লিখেছেন। ল্যাপটপে বিভিন্ন জিহাদী বইয়ের সফটকপি ও জঙ্গি প্রশিক্ষণের অসংখ্য স্থির চিত্র র্যাব দেখতে পায়।
জিজ্ঞাসাবাদে তিনি র্যাবকে জানান, তিনি কোরআনে হাফেজ। ১৯৯৪ সালে আবু জিহাদ নামে হুজিতে যোগদান করেন। ঐ থেকে তিনি আবু জিহাদ পরিচয়ে যাত্রাবাড়ী খায়রুন কুরুন নামে একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার জাতীয় পরিচয়পত্রে সাজেদ মোহাম্মদ ফায়েজ, পাসপোর্টে খায়রুল হাসান ও নিজের লেখা ইসলামী বইয়ে মুফতি যোবায়ের আবদুল্লাহ নাম ব্যবহার করেন। তিনি খোদার পথে কাজ করেন বলে সকলের কাছে পরিচয় দেন। তিনি চাঁদপুর জেলার হাইমচর উপজেলার নয়ানী গ্রামের বাসিন্দা মরহুম ফয়েজ উল্লাহর পুত্র।