পশ্চিমবঙ্গ ও প্রতিবেশী রাজ্যের মাটিতে বসেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রথম সারির কয়েকজন নেতাকে হত্যা করার ছক কষে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাত-উল-মুজাহিদিনের (জেএমবি) একদল দুষ্কৃতকারী। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা এনআই-এর তিন উচ্চপদস্থ কর্তার বক্তব্য উল্লেখ করে মঙ্গলবার প্রথম খবরটি ফাঁস করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এদিন রাত ৮টায় পশ্চিমের আরেক সংবাদ মাধ্যম একই ষড়যন্ত্রের তথ্য সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ দেখা দেয়। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের তত্পরতাও বেড়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় জোর তল্লাশি শুরু হয়।
খবরটি যে নেহায়েত রটনা বা আশঙ্কামূলক অনুমান নয়, তা মনে করার সঙ্গত কারণ রয়েছে। দিন কয়েক আগে ভারতীয় একটি রাজনৈতিক দলের একজন নেতা বললেন, বাংলাদেশে অঘটন ঘটানোর চেষ্টা হচ্ছে। বিশদ ব্যাখ্যা করে তিনি জানালেন, ঢাকা ও অন্যান্য এলাকা থেকে পালিয়ে আসা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের কর্মীরা এখানে এসে আশ্রয় নিয়ে এখানকারই কয়েকটি উগ্র সংগঠনের মদদে ঐপারে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শুরু করতে পারে। তাদের প্রথম লক্ষ্য শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেতারা। দ্বিতীয় টার্গেট, হাসিনা সরকারের সহযোগীরা। একই সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার উপরও হামলা চালাতে পারে।
২ অক্টোবর, বর্ধমানের খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণের পর সন্দেহ একটু দানা বাঁধতে থাকে। দিল্লীর জাতীয় গোয়েন্দারা যখন তদন্তের ভার হাতে নেন এবং রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক অস্ত্র তৈরির কারখানা ‘আবিষ্কৃত’ হতে থাকে, তখনও মনে হয়- রাজ্য সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে কেন্দ্র বাড়াবাড়ি করছে। কিন্তু খাগড়াগড়ের যে বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটে সেই বাড়ির ভেতর থেকে বহু বিস্ফোরক উদ্ধার হল। উদ্ধারের পর প্রকাশ্যে দামোদরের তীরে এসব নিষ্ক্রিয় করতে থাকলেন নিরাপত্তারক্ষীরা। তখনই সতর্ক হয়ে খবরের খোঁজে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোটা শুরু। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা ও তথ্যের উপর নির্ভর করে দক্ষিণ আসামের করিমগঞ্জ ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বড়পেটা থেকে জঙ্গিদের গোপন আস্তানার খুচরো সংবাদ আসতে থাকে। মুর্শিদাবাদের লালগোলা ও অন্যান্য এলাকায় এসব দুষ্কৃতকারী যে ২০১১ সালের পর থেকে আসা-যাওয়া করতে থাকে— এই তথ্যের সন্ধান মেলে। লালগোলা ও জলঙ্গীতে আমার সর্বশেষ সফরের সময় মনে হয়েছে, নামেমাত্র কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ওখানকারই বাসিন্দা একজন গদ্যশিল্পী জানালেন, পোড়াবাড়িতে কী শিক্ষা দেয়া হয় জানি না। খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণের পর কাউকে তো আর দেখছি না।
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের অভিযোগ, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানে অস্ত্র শিক্ষা দেয়া হত, বিশেষত মহিলাদের। যেসব পুরুষ আসা-যাওয়া করত, তারা এলাকায় অচেনা। এসব অভিযোগককে, এমনকি কয়েকজন দুষ্কৃতকারীকে গ্রেফতারের পরও জঙ্গি তত্পরতার বিষয়টিকে আমল দেয়নি। সন্দেহ বেড়েছে। সংশয় দেখা দিয়েছে। কিন্তু এখন পশ্চিমবঙ্গের সেকুলার মুখের উদ্বেগ, গ্রামীণ জনতার আতঙ্ক আর জঙ্গি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তাদের আক্রোশ যত বাড়ছে, ততই মনে হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গকে বহিরাগত জঙ্গিরা উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ ভেবে বসেছিল। আর এখানে আস্তানা গেড়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে, পশ্চিমবঙ্গের বিরুদ্ধে, স্থায়ী সম্প্রীতির বিরুদ্ধে আঘাত হানার চেষ্টা করছিল। তারা একদিনে বেড়ে ওঠেনি। একদিনে এই উপমহাদেশের নানা প্রান্তের দুষ্কৃতকারীদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করে তত্পরতা শুরু করেনি। বর্ধমানের বিস্ফোরণের পর তাদের সুপরিকল্পিত চক্রান্তের মুখ খুলে যায়। প্রাথমিক তদন্তের পরই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা জানিয়ে দেন, যারা এই অপকাণ্ড ঘটিয়েছে, ঘটনার পর পালিয়ে গেছে- তাদের অনেকেই বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জেএমবির সক্রিয় সদস্য। তাদের সঙ্গে ভারতীয় কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনও যোগ দেয়। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে মনে করা হচ্ছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল- এক. বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে উত্খাত করে অরাজক পরিস্থিতি গড়ে তোলা। দুই. পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী সম্প্রীতির বুনিয়াদে ফাটল তৈরি করা। তিন. আসামেও অশান্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। চার. দিল্লিতে ক্ষমতাবদলের সুযোগ নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ককে বিগড়ে দেয়া। সৌভাগ্য, এসব লক্ষ্যপূরণ হয়নি। তাই সর্বশেষ পরিকল্পনার ছক কষে ভাবতে থাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া ও অন্যান্য দলের নেতাদের হত্যা করে ১৯৭৫-এর পরের অরাজক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে হবে।
বর্ধমানের বিস্ফোরণে শাকিল গাজি নামে যে লোকটি মারা যায়, সে জেএমবির সক্রিয় সদস্য ছিল। কওসর নামে আরেকটি লোক পালিয়ে যায়। সে একই সংগঠনের লোক বলে জানা গেছে। আব্দুল হাকিম নামে যে এখন চিকিত্সাধীন, সে-ও বহিরাগত। কয়েকজন মহিলাকেও আটক করা হয়েছে। বিভিন্ন স্তরে জেরা করে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, ২০১১ সাল থেকে শাকিল হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করছিল। পশ্চিমবাংলায় পালিয়ে এসে তারা বর্ধমানে গোপন ঘাঁটি গড়ে তোলে। মুর্শিদাবাদ ও আসামেও সহযোগীদের খুঁজে নেয়। গত তিন বছরে এসব জঙ্গি চার দফায় ১২০টি আইআইডি (ইম্প্রভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বাংলাদেশে পাঠায়।
জানা গেছে, জঙ্গিদের বাংলাদেশ বিরোধী তত্পরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংকে তিনি বলেছেন, খুঁজে বের করে সব জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিতে হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক কর্তা দিল্লি থেকে জানিয়েছেন, এতদিন অভিযোগ ছিল ভারত বিরোধী কাজে সন্ত্রাসবাদীরা বাংলাদেশের মাটিকে ব্যবহার করতো। এখন পাল্টা কথা আমাদের বিরুদ্ধেই শোনা যাচ্ছে।
জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপদেষ্টা অজিত ডোবাল পশ্চিমবঙ্গ সফর শেষে দিল্লিতে পৌঁছেই মঙ্গলবার সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। জেএমবি পশ্চিমবঙ্গের কোথায় কোথায় নিজের শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছে, তার মানচিত্র মন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। এ বিষয়ে রাজনাথ কী মন্তব্য করেছেন, এখনো জানা যায়নি। বৈঠকের মুহূর্তে তাকে বড় উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল। অনুমান করা হচ্ছে, দু’-একদিনের মধ্যেই হাসিনা হত্যার ছক ও অন্যান্য ষড়যন্ত্রের তথ্য দিল্লি ঢাকাকে জানিয়ে দেবে।