ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বন্ধ হয়ে যাওয়া দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা অফিস পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শুক্রবার সকালে কাওরান বাজারে ১০২, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ের বিএসইসি (বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশন) ভবনের ১১ তলায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
এর আগে ঐ ভবনে ২০০৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভি ও আরটিভি’র কার্যালয় পুড়ে যায়। শুক্রবারের এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঐ ভবনে অবস্থিত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভি ও আরটিভি’র সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। তবে অগ্নিকাণ্ডে এই দুইটি টেলিভিশন চ্যানেলের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানা গেছে। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৫ টার দিকে আরেকটি বেসরকারি চ্যানেলের সহযোগিতায় এনটিভি তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু করে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টার দিকে আরটিভি বিএসইসি ভবনের স্টুডিও থেকে সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু করে। অগ্নিকাণ্ডের পর বেলা ১২ টা ৪০ মিনিটে টেলিভিশন চ্যানেল দুইটির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।
শুক্রবার সকালে আমার দেশ পত্রিকার অফিসটি স্থানান্তরের কাজ চলছিল। এই অফিসের মালামাল গুলশান নিকেতন ১ নম্বর রোডের একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সকাল সাড়ে ১১ টায় অফিসের স্টোর রুম ও বিজ্ঞাপন সেকশন থেকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে। স্থানান্তরের কাজে চারজন কর্মকর্তা-কর্মচারি এবং ৬ জন শ্রমিক প্রথমে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। মূহুর্তের মধ্যে আগুন গোটা ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে প্রথম দফায় ফায়ার সার্ভিসের ১৬ টি ইউনিট গিয়ে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। এর সঙ্গে আরো ৫ টি ইউনিট অগ্নিনির্বাপনের কাজে যোগ দেয়। দুপুর ২ টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ সময়ের মধ্যে আমার দেশ পত্রিকার অফিসের প্রায় শতাধিক কম্পিউটার, ২৩ টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রনের যন্ত্রপাতি, চেয়ার টেবিল ও অফিসের অন্যান্য জিনিসপত্র পুড়ে যায়। এই ১১ তলায় ল’অফিস ব্যারিষ্টার তানজিব আলম এ্যান্ড এসোসিয়েটস ও সার্ভারনেট নামে একটি গার্মেন্টস এক্সাসারিজ সরবরাহের প্রতিষ্ঠান ছিল। অগ্নিকাণ্ডে ঐ দুইটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সার্ভারনেট প্রতিষ্ঠানের সকল আসবাবপত্র ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়ে গেছে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (পরিকল্পনা) শেখ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আগামী ৭ কার্য দিবসের মধ্যে ঘটনা তদন্ত করে রিপোর্ট ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, বিএসইসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোসেন চৌধুরী জানান, সংস্থার পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ মোজাম্মেল হককে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরপর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কোন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড জড়িত আছে কি না তা তদন্ত করা হবে। তদন্তে নাশকতার অভিযোগ প্রমাণ হলে আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
২০০৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে শিল্পমন্ত্রী বলেন, ঐ সময় ঘটনায় তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে। তবে ঐ রিপোর্টটি দেখে তিনি এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিবেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএসইসি’র চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ হোসেন চৌধুরী ও এনটিভি’র চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
যেভাবে আগুনের সূত্রপাত :
দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার নাছির উদ্দিন শোয়েব জানান, আমার দেশ পত্রিকা অফিস গুলশানের নিকেতন এলাকা একটি বাড়িতে সাময়িকভাবে স্থানান্তর করার জন্য শুক্রবার সকাল থেকে অফিসের ৮ টি এসি খুলে ফেলা হয়। অফিস স্থানান্তরের কাজে নিয়োজিত ছিলেন ইলেকট্রিশিয়ান আহমদ আলী, পারভেজ, স্টোর কিপার মোহসীন, পিয়ন আব্বাস আলী, ঝাড়ুদার তরুন দাস এবং ৬ জন শ্রমিক। ৮ টি এসি ও ৪ টি চেয়ার টেবিল তারা লিফটে করে নীচে নামিয়ে আনেন। এরপর তারা উপরে গিয়ে দেখতে পান যে অফিসের পূর্ব-দক্ষিণ কোনায় স্টোর রুম ও বিজ্ঞাপন সেকশনের সিলিং থেকে দাউ দাউ করে আগুন ঝলছে। প্রাথমিকভাবে তারা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। আগুন অফিসের অন্যান্য আসবাবপত্রে ছড়িয়ে পড়লে তারা চিত্কার দিয়ে নীচে নেমে আসেন। সকাল ১১ টার ৫০ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসকে আগুনের খবর দেয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে অফিস পিয়ন আব্বাস আলী বলেন, অফিস পরিবর্তনের জন্য আরো কয়েকটি এসি ও চেয়ার টেবিল নামানোর প্রস্তুতি নেয়ার সময় স্টোর রুমের ছাদ থেকে আগুনের ফুলকি দেখতে পান। তখন স্টোর রুম তালাবন্ধ ছিল। স্টোর রুমের চাবি যার কাছে থাকে, তাকে ফোন করে ডেকে আনা হয়। পরে চাবি দিলে খুলে নিজেরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়া হয়।
যেভাবে আগুন নিয়ন্ত্রনে আসে :
অগ্নিকান্ডের খবর পেয়ে মাত্র ৭ মিনিটের মধ্যে বিএসইসি ভবনে ১৫ টি ইউনিট হাজির হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভবনের সামনে দুইটি লেডার লাগিয়ে ১১ তলায় পানি দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে আগুনে তেজ কমে এলেও ভবনের ভেতরে প্রচুর ধোঁয়া জমে যায়। ধোঁয়া বের করতে ভবনের বেশ কিছু জানালার কাঁচ ভেঙে ফেলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বেলা ২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরোপুরি নির্বাপন করতে বিকাল ৪টা গড়িয়ে যায়। বিএসইসি ভবন থেকে আগুনের হলকা ও ধোঁয়া আশপাশের ভবনে ছড়িছে পড়ার উপক্রম হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে পাশের বিডিবিএল ভবনের উত্তরদিকে দেয়াল জুড়ে পানি ছিটিয়ে দেয়া হয়। বিএসইসি ভবন ঘিরে উত্সুক জনতার ভীড় জমে যায়। পরে র্যাব-পুলিশ জনতাকে নির্দিষ্ট দূরত্বে সরিয়ে দেয়। এসময় কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ দিয়ে যানবাহন চলাচল কিছুটা বাধাগ্রস্থ হয়। গুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান জানান, এই ভবনে অগ্নিকা্ল প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ছিল না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস স্থানান্তরের সময় হয়তো শর্ট সার্কিটের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আগের ঘটনার সঠিক তদন্ত হয়নি বলে বারবার এমন ঘটনা ঘটছে। এই অগ্নিকা্লের ঘটনা রহস্যজনক মনে হচ্ছে। এটা নাশকতা নয় তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেন তিনি।
এনটিভি’র চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসাদ্দেক আলী বলেন, বরাবারই এ ভবনে আগুন লাগে, আর আমি বারবারই ক্ষতিগ্রস্ত হই। তদন্ত হয় কিন্তু রিপোর্ট পাই না। তদন্ত কি হয় তা জানা যায় না। যে কারণে এটা হয়েছে, তা সনাক্ত করতে হবে। এটা যেন ফের না ঘটে।