তৈরি পোশাক শিল্পে গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটলেও বেশকিছু কারখানার নিরাপত্তা এখনও হুমকির মুখে রয়েছে। জানা গেছে, অন্তত: ৩৫ শতাংশ গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা নেই। বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই ২৭ শতাংশ কারখানায়। এসব কারখানার নিরাপত্তা সংক্রান্ত কার্যক্রম চলছে এক প্রকার জোড়াতালি দিয়ে। সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। দেশের মোট ১০৮টি পোশাক শিল্প কারখানা পরিদর্শন শেষে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৩টি কারখানাই মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সদস্য। ৮টি বিকেএমইএ’র এবং ৩৭টি কারাখানা কোন সমিতির সদস্য নয়।
এদিকে দেশের পোশাক শিল্পখাতের নিরাপত্তা নিয়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর জরিপ করলেও অন্যান্য খাতের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপ করা হয়নি। তবে অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, পোশাক শিল্প বাদে অন্যান্য খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা আরো নাজুক। পোশাক রপ্তানির জন্য সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হলেও অন্যান্য খাতে তেমন বাধ্যবাধকতা নেই। এজন্য তারা নিরাপত্তার বিষয়টি কঠোরভাবে পালনও করে না। তাই শিগগিরই দেশের সকল শিল্পখাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হবে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
অধিদপ্তরের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৭৩ শতাংশ পোশাক কারখানায় বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যবস্থা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিজিএমইএ’র সদস্যভুক্ত ৭৮ শতাংশ কারাখানায় বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক আছে। আর নীটওয়্যার শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সদস্য ৭৪ শতাংশ কারখানায় বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সংঘঠিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিকদের ব্যাপক প্রাণহানি হলেও অনেক কারখানায় অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। প্রায় ৬৫ শতাংশ কারখানায় এ ব্যবস্থা যথাযথ আছে। এক্ষেত্রে বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত কারখানাগুলোর অবস্থা কিছুটা ভালো। তাদের ৮১ শতাংশ কারখানায় এ ব্যবস্থা যথাযথ আছে। বিকেএমইএ সদস্যভুক্ত কারখানাগুলোর মধ্যে মাত্র ৬০ শতাংশের অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রয়েছে। ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তার দিক থেকেও গার্মেন্টস কারখানাগুলো পিছিয়ে রয়েছে। বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত কারখানাগুলোর মধ্যে ২৭ শতাংশ ভবনের কাঠামোগত জটিলতা রয়েছে। আর বিকেএমইএভুক্ত কারখানাগুলোর মধ্যে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে ২৮ শতাংশের।
তবে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সহ-সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, সরকারের ওই দপ্তর কিসের ভিত্তিতে এই রিপোর্ট করেছে তা আমার জানা নেই। আজকাল বিদেশে পণ্য রপ্তানি করতে হলে কমপ্লায়েন্স বাধ্যতামূলক। তিনি দাবি করেন, কোন কারখানায় অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকলে ওই কারাখানাকে বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ’র সদস্যপদ দেয়া হয় না। আর বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার বিষয়টিও আপেক্ষিক। কোন কারখানার মালিক নিশ্চয় জেনে-শুনে তার কারখানাকে নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে রাখবেন না।
প্রতিবেদনে অধিদপ্তর শুধু ভবনের অবস্থা, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথাই জানায়নি, পাশাপাশি কারখানার শ্রমিকদের চাকরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছে। এতে দেখা যায়, ২৩ শতাংশ কারখানার শ্রমিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র নেই। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের চাকরির বই সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক হলেও প্রায় অর্ধেক কারখানা তা সংরক্ষণ করে না। তবে শতভাগ কারখানা শ্রমিকদের হাজিরা কার্ড সংরক্ষণ করে। ১৩ শতাংশ কারখানা শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ করে না। অনিয়মিতভাবে বেতন-ভাতা পরিশোধ করে ২৮ শতাংশ কারখানা। ছুটির বিধান অনুসরণ করে না ৩১ শতাংশ কারখানা। প্রসূতি কল্যাণ ছুটি বাধ্যতামূলক হলেও ৪৬ শতাংশ কারখানা তা মানে না। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ ডে-কেয়ার সেন্টার নেই ৬৪ শতাংশ কারখানায়। দুর্ঘটনা সংক্রান্ত নোটিশ দেয়া হয় না ৮৪ শতাংশ কারখানায়। কোন দুর্ঘটনা সফলভাবে মোকাবেলার জন্য সেফটি বোর্ডের বিধান রয়েছে। ৫৭ শতাংশ কারখানায় এ বোর্ড নেই।
তবে শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়ে কারখানাগুলো পিছিয়ে থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যেমন শতভাগ কারখানায় কোন শিশু শ্রমিক নেই। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রয়েছে ৯৮ ভাগের বেশি কারখানায়। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা আছে ৯৬ শতাংশ কারখানায়।