কামারুজ্জামানের চূড়ান্ত রায় সোমবার

 
 
 
ইত্তেফাক রিপোর্ট
জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চূড়ান্ত রায় সোমবার সকালে ঘোষণা করা হবে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করবেন। এর আগে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কামারুজ্জামানকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেন কামারুজ্জামান। দীর্ঘ শুনানির পর গত ১৭ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণা অপেক্ষমান রাখে আপিল বিভাগ। প্রায় দেড় মাস পর আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় রায় ঘোষনার বিষয়টি এক নম্বরে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গত বছরের ৯ মে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তার বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগের মধ্যে সোহাগপুর ‘বিধবাপল্লীতে’ নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও গোলাম মোস্তফা হত্যাকাণ্ডের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া বদিউজ্জামান ও দারাসহ ছয়জনকে হত্যার দায়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া একাত্তরে শেরপুর কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ আবদুল হান্নানের প্রতি অমানবিক আচরণের দায়ে কামারুজ্জামানকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। তবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় যাবজ্জীবন ও ১০ বছরের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে একীভূত হয়ে যাবে বলে ট্রাইব্যুনাল রায়ে উল্লেখ করে। এ ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে গত বছরের ৬ জুন আপিল করে কামারুজ্জামান। বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চে গত জুন মাসে এ আপিলের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন— বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। সেপ্টেম্বর মাসে এ আপিলের শুনানি শেষ হয়।
এদিকে কামারুজ্জামানের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল থাকবে বলে আশা ব্যক্ত করেছেন এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম। রবিবার নিজ কার্যালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনাল কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। আশা করি এই দণ্ড বহাল থাকবে।
অন্যদিকে, কামারুজ্জামানের আইনজীবী এসএম শাহজাহান ও এম তাজুল ইসলাম বলেন,  আমরা রায়ের অপেক্ষায় আছি। আশা করি আপিলকারী খালাস পাবেন।
 
কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৫ অভিযোগ:
 
হত্যা ও গণহত্যার দায়ে ফাঁসি
এক. (তৃতীয় অভিযোগ): একাত্তরের ২৫ জুলাই ভোরে কামারুজ্জামানের পরিকল্পনা ও পরামর্শে রাজাকার, আলবদরসহ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি উপজেলার সোহাগপুর গ্রাম ঘিরে ফেলে। এরপর তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১২০ জন পুরুষকে ধরে এনে হত্যা করে। ধর্ষণের শিকার হন গ্রামের নারীরা।
দুই. (চতুর্থ অভিযোগ): ১৯৭১ সালের ২৩ আগস্ট মাগরিবের নামাজের সময় গোলাম মোস্তফা তালুকদারকে ধরে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। কামারুজ্জামানের নির্দেশে তাকে সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে বসানো আলবদর ক্যাম্পে রাখা হয়। মোস্তফার চাচা তোফায়েল ইসলাম এরপর কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করে তার ভাতিজাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু ওই রাতে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা গোলাম মোস্তফা ও আবুল কাশেম নামের আরেক ব্যক্তিকে মৃগী নদীর ওপর শেরি ব্রিজে নিয়ে গিয়ে গুলি করে। গুলিতে গোলাম মোস্তফা নিহত হলেও হাতের আঙুলে গুলি লাগায় নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বেঁচে যান আবুল কাশেম।
 
দুই ঘটনায় যাবজ্জীবন
তিন. (প্রথম অভিযোগ): কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে একাত্তর সালের ২৯ জুন শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী থানার কালীনগর গ্রামে ফজলুল হকের ছেলে বদিউজ্জামানকে রামনগর গ্রামের আহম্মদ মেম্বারের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। এরপর তাকে নির্যাতন করে আহম্মদনগরের রাস্তার ওপরে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে লাশ টেনে নিয়ে কাছাকাছি কাঠের পুলের নিচে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
চার. (সপ্তম অভিযোগ): ১৯৭১ সালের ২৭ রোজার দিন দুপুরে টেপা মিয়ার বাড়ি ঘেরাও করে আলবদর বাহিনী। এরপর কামারুজ্জামানের নির্দেশে টেপা মিয়ার ছেলেসহ ৫ জনকে হত্যা করা হয়।
শিক্ষক নির্যাতন: ১০ বছরের সাজা
পাঁচ. (দ্বিতীয় অভিযোগ): একাত্তরের মে মাসের মাঝামাঝি এক দুপুরে শেরপুর কলেজের তত্কালীন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রভাষক সৈয়দ আব্দুল হান্নানকে নির্যাতনের ঘটনায় ১০ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়।

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ সাতটি অভিযোগ আনে। এর মধ্যে ৫টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়। বাকি দুটি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেয় ট্রাইব্যুনাল।