‘মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনে বাধা দেয়ার অধিকার কারো নেই’

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা বলেছেন, ভয় দেখিয়ে, বাধা দিয়ে নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে বিঘ্ন সৃষ্টি করার অধিকার কারো নেই। বিনা ভয়ে দিনযাপন করা মানুষের মৌলিক অধিকার। চলতি সপ্তাহে জামায়াতে ইসলামীর টানা হরতাল প্রসঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এ মন্তব্য করেন। গতকাল রবিবার বিকালে বারিধারায় মার্কিন দূতাবাসে নিজ দপ্তরে ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাত্কারে ড্যান মজীনা একথা বলেন। সাক্ষাত্কারে ঢাকা ও ওয়াশিংটন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, চলমান রাজনৈতিক অবস্থা, হরতাল পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ সম্ভাবনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন তিনি। ড্যান মজীনা বলেন, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার ও জবাবদিহিতার আওতায় আনাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে। এ বিচার হতে হবে স্বচ্ছ, স্বাধীন, আন্তর্জাতিক আইন ও বিধি-বিধান অনুসরণ করে। গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের বিধানও রয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিবাদ নাগরিকদের অধিকার বিঘ্ন করে হতে পারে না। সাধারণ মানুষের অধিকারের বিনিময়ে প্রতিবাদ করা যায় না।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে মূল্যায়ন করতে গিয়ে ড্যান মজীনা সাক্ষাত্কারে বলেন, গত আগস্ট মাসে যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক বিশেষ মার্কিন দূত স্টিফেন  জে র্যাপ সর্বশেষ ঢাকা সফর করেন। এর আগে আরও চারবার আসেন এই বিশেষজ্ঞ। তার মত হচ্ছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হওয়া দরকার। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের স্বার্থে আরো উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপির বয়কটের মাধ্যমে ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে ড্যান মজীনা বলেন, ঐ নির্বাচন নিয়ে মার্কিন সরকারের অবস্থান নিয়ে কোন ধরনের অস্পষ্টতা নেই। পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিক্রিয়া, সিনেটে শুনানিসহ বেশ কয়েকবার মার্কিন সরকারের মতামত এসেছে এ নির্বাচন নিয়ে। সেই মতামত ও অবস্থান এখনো বহাল। সর্বশেষ ২৮ ও ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত দুই দেশের অংশীদারিত্ব সংলাপেও বৃহত্তর আকারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিভাবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায় সে ব্যাপারে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। তৃতীয় দফার এই সংলাপে গণতন্ত্র ছাড়াও উন্নয়ন, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক ইস্যু সবই এসেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় সংলাপের আলোচনার পর্যালোচনা হয়েছে। কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ ও বন সবক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন নতুন দিক নিয়ে কথা হয়। নিরাপত্তা ও সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ অনেক ভাল কাজ করছে। বাংলাদেশ একদিন ‘এশিয়ান টাইগার’ হবে। সেই লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। সেজন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুত্ সরবরাহ, সমুদ্রে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান করা দরকার। আরো দরকার স্থিতিশীলতা ও উপযুক্ত অবকাঠামো।
‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ কেন গুরুত্বপূর্ণ’? এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন দূত বলেন, বাংলাদেশ একটি উদার, গণতান্ত্রিক ও বহুমতের দেশ। ধর্মনিরপেক্ষ ও সহিষ্ণু দেশ। সেজন্যই যুক্তরাষ্ট্র এদেশকে গুরুত্ব দেয়। ইরাক ও সিরিয়ার মত দেশের বিপরীতে আজ শান্তিপূর্ণ ও অগ্রসর বিশ্বের জন্য বাংলাদেশের মতোন দেশই প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী শন্তি রক্ষায় এদেশ অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এসব কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। দু’দেশের সম্পর্ক এই মুহূর্তে যে পর্যায়ে আছে তা অতীতে কখনো ছিল না। সামনে আরো এগুবে আশা করি। অংশীদারিত্ব সংলাপ হয়েছে। এখন দুই পররাষ্ট্র মন্ত্রীর মধ্যে বৈঠক হবে। ভবিষ্যতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সফরের পারিকল্পনাও রয়েছে।
ভবিষ্যত্ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ড্যান মজীনা বলেন, সময়ই বলে দেবে। এদেশের জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে কিভাবে গণতন্ত্র চলবে, নির্বাচন হবে।
ড্যান মজীনা তৈরি পোশাক খাত সম্পর্কে বলেন, রানা প্লাজা আর তাজরীন গার্মেন্টেস-এর মতো হূদয়বিদারক ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা চাই না। গার্মেন্টস খাতে এখন রূপান্তর হচ্ছে। রূপান্তর শেষে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বিশ্বের সেরা পোশাক হবে। আমার বিশ্বাস, বর্তমান অবস্থা সেদিকেই অগ্রসর হচ্ছে। এ অবস্থা ধরে না রাখলে পোশাকের বাজার চলে যাবে ভিয়েতনাম আর ইথিওপিয়ার মতো দেশের হাতে।