আলোকপাত: ছিনতাই প্রতিরোধে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা

২৮ অক্টোবর (২০১৪) সকালে ছিনতাইকারীর হাতে পড়ে গৃহবধূ খুন হলেন মিরপুর রোডের সোবহানবাগ মসজিদ এলাকায়। ধানমণ্ডি-গাবতলি-মোহাম্মদপুরসহ ঢাকার অনেক জায়গায় কার-মাইক্রোবাস-অটোরিকশা-মোটর সাইকেল থেকে ব্যাগ টেনে নিয়ে ছিনতাই করার ঘটনা বহু পুরানো। ঢাকা শহরে ছিনতাইকারীরা এখন মৃত্যুদূত। এখানে জীবনের নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। চলতি বছর ছিনতাই হয়েছে যথাক্রমে- জানুয়ারি-১৯, ফেব্রুয়ারি ২০, মার্চ ২৬, এপ্রিল ১৯, মে ২১, জুন ১৫, জুলাই ২৫, আগস্ট ২৮, সেপ্টেম্বর ২৩ মোট -১৯৬টির বেশি। এসব ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যাও শতাধিক। ২০১৩ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে রাত সোয়া এগারোটায় আসাদগেট থেকে মিরপুর রোড ধরে শ্যামলীতে আসার সময় আমার ল্যাপটপের ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়েছে মোটর সাইকেল আরোহী দুজন দুর্বৃত্ত। ঐ দুর্বৃত্তদের ধরার জন্য আমি ‘ধর’ ‘ধর’ বলে চিত্কার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। তারা আওরঙ্গজেব রোড ধরে পালিয়ে যায় মোহাম্মদপুরের দিকে। ঘটনার পর পরই আমি র্যাবের মিডিয়া এন্ড লিগ্যাল উইং-এর তত্কালীন পরিচালক উইং কমান্ডার হাবিব সাহেবকে বিষয়টি জানালে তিনি শিয়া মসজিদ র্যাব ক্যাম্পের অধিনায়ক ফয়সাল সাহেবকে ঘটনাটি জানান। কিন্তু র্যাবের টহল দল আসাদ গেট থেকে আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস ও অনুসন্ধান করে কিছুই উদ্ধার করতে পারেননি। পরের দিন মোহাম্মদপুর থানায় জিডি ও পরে মামলা করি(মামলা নং ৩৫) এবং উক্ত র্যাব ক্যাম্পে লিখিত অভিযোগ প্রদান করেছিলাম। ল্যাপটপের সঙ্গে আমার জাতীয় পরিচয়পত্র, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসহ তিনটি পেন-ড্রাইভ এবং দুটি ইন্টারনেট মডেম ও আরো কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির সূত্রে গত সাত’বছরে আমার ল্যাপটপ ও পেন-ড্রাইভে বিস্তর তথ্য সংগৃহীত হয়েছিল। সে সব তথ্য আর লেখার উপকরণ আমার কাছে আর্থিক মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। তার জন্য আমি আমার কাতরতাও প্রকাশ করেছি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে। কিন্তু ছিনতাইকৃত জিনিসগুলো ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা তখনই শূন্য বলে মনে হয়েছিল। এখনো এ ধরনের ঘটনায় ফল লাভের আশা নেই বলেই মনে হচ্ছে। তবে আমার সেই ঘটনার পর ছিনতাই ও তার প্রতিরোধ সম্পর্কে র্যাব, পুলিশ সদস্য ও বিশিষ্টজনদের সঙ্গে কথা বলে কিছু মতামত অর্জনে সক্ষম হয়েছি।
ছিনতাই  উন্নত বিশ্ব ইউরোপ-আমেরিকাতেও আছে। কিন্তু পুলিশি তত্পরতা সেখানে বেশি বলেই অপরাধীরা সহজেই ধরা পড়ে। বরং জাপান-সিঙ্গাপুর ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে এই ধরনের কর্মকাণ্ড নেই। বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত এর প্রকোপ কমানো যায়নি। তবে ছিনতাই প্রতিরোধ ও নির্মূলে র্যাব ও পুলিশের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। প্রতিটি থানার নির্দিষ্ট এলাকা যেমন উক্ত থানার পুলিশ সদস্যদের নখদর্পণে তেমনি র্যাবের ক্যাম্পগুলোরও নির্দিষ্ট এলাকা নির্দেশ করা আছে। অবশ্য র্যাব ও পুলিশ সদস্য সম্পর্কে জনগণের দুই ধরনের ধারণা। র্যাব সদস্যরা অপরাধী সনাক্ত ও ধরার বিষয়ে যতটা চৌকস পুলিশরা ততটা নন। পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় এলাকার জনগণের সঙ্গে সহজেই মিশতে পারেন। অপরাধী ধরার জন্য তাদের সোর্সের পরিমাণও বেশি। কিন্তু দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে পুলিশের থানা পর্যায়ে। যা আবার র্যাবের ক্ষেত্রে উল্টো। র্যাবের তত্পরতা, দক্ষতা এবং অপরাধ বিষয়ে গবেষণা বেশি অগ্রগামী। অপরাধী, সন্ত্রাসী গ্রেফতারে তাদের পরিসংখ্যানও বেশি। উল্লে­খ্য, র্যাব পুলিশেরই এলিট ফোর্স। এতদসত্ত্বেও র্যাবের মাইন্ডসেট আলাদা।(এ বিষয়ে আরো ব্যাখ্যার দাবি রাখে, স্বল্প পরিসরে বিষয়টি এড়িয়ে গেলাম) এই উভয় সংস্থা জনগণের জানমাল রক্ষায় কেবল নয় দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক অবদান রেখেছে। এজন্য ছিনতাই প্রতিরোধে তাদের একক ভূমিকা নয়; তাদের সঙ্গে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের একত্রিত হওয়া দরকার।
ছিনতাই প্রতিরোধ ও নিমূর্লে প্রথমে প্রয়োজন আমাদের নিজস্ব সচেতনতা। নিজে যদি আগে থেকে সতর্ক থাকতে পারি তাহলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পরিহার সম্ভব বলে মনে করেন অনেকেই। কিন্তু সব সময় মানুষ একই ধরনের মানসিক অবস্থায় থাকবে এটাও মনে করার কোনো কারণ নেই। তাছাড়া রয়েছে রাস্তা-ঘাট, পাড়া-মহল্ল­ার বিচিত্র কোলাহল আর নানা কেরিকেচারের মানুষের রঙ-ঢং। এজন্য আমরা সর্বদা নিজের বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে গন্তব্যে এগিয়ে যাব এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। একজন বিক্ষিপ্ত মানসিক অবস্থার ব্যক্তির জন্য দুর্বৃত্ত কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে পরিস্থিতি সামলানো দুরূহ। কিন্তু মানুষের সচেতনতা কেবল আত্মরক্ষার জন্য নয় বরং আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার জন্যও তা দরকার। টহলে কিংবা তদন্তে বের হয়ে এসব সংস্থার সদস্যরা প্রত্যাশিত সহযোগিতা পান না। রাস্তার লোকরা দেখলেও ছিনতাই ঘটনার পরে সেই তথ্য পুলিশকে জানানো থেকে বিরত থাকে। কোনকিছু দেখলো কিনা তাও বলার প্রয়োজন মনে করে না। অন্যের দায়-দায়িত্ব নেবার তার দরকার নেই- এ রকম মানসিকতা অধিকাংশের। অথচ এ ধরনের ঘটনার শিকার সেই ব্যক্তিরাও হতে পারে। মনে রাখতে হবে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সামাজিক সচেতনতার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল সড়কগুলোতে ‘সিসিটিভি’ কভারেজ অত্যন্ত জরুরি। তাহলে অলি-গলিতে পুলিশ-র্যাবের টহল বাড়ানো সম্ভব। এতে ছিনতাইকারীরা অপরাধ করে পালাতে পারবে না।   
টান মারা পার্টি কিংবা অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাইকারী অপহূত মালামাল বিক্রি করে ঢাকাসহ দেশের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায়। চোরাই মাল বিক্রি বন্ধ করতে হবে। উপরন্তু চোরাই পণ্য কেউ ক্রয় করলে তাকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। আর এ ধরনের মার্কেট বন্ধ হলে ছিনতাইকারীরা নিরুত্সাহী হবে দুর্বৃত্তপনায়। অধিকাংশ ছিনতাইকারী মাদকসেবী। মাদকের জন্য ছিনতাই আর হত্যা তাদের রোগের অপর নাম। মাদককে না বলার অভ্যাসটি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃঢ়ভাবে প্রচলন করা দরকার। ইদানিং রাস্তা-ঘাট-পার্ক ও পরিবহনে যেভাবে ধূমপায়ীদের অত্যাচার বেড়েছে তাতে আইনের সহায়তা চেয়েও এই ক্ষতিকর ও বিরক্তকর উপদ্রব থেকে আমরা বাঁচতে পারছি না। প্রকাশ্যে ধূমপানের শাস্তি ৩০০ টাকা করা হলেও অতীতের মতো বর্তমান সরকারের কঠোর তদারকির অভাব রয়েছে। তবে বর্তমান সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যদিও ছিনতাই বন্ধ হয়নি। অর্থাত্ আইন থাকলেও তার প্রয়োগের অভাবে জনজীবনে বিড়ম্বনা বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। এজন্য ছিনতাই প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও সেই আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে।
ছিনতাই প্রতিরোধ ও নির্মূলে এলাকা চিহ্নিতকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অপরাধ বিষয়ে প্রতিটি থানা এবং র্যাব ক্যাম্পগুলোতে এলাকা ভিত্তিক অপরাধ ও অপরাধীদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকে। সেক্ষেত্রে ছিনতাইয়ের মতো একটি অপরাধ সংঘটিত হলে সঙ্গে-সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণে সামর্থ্য রাখেন আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। অপরদিকে ছিনতাই-পয়েন্টগুলোতে টহল বাড়ানো হলে অপরাধীদের দমন করা সম্ভব। কিন্তু ছিনতাইকারীরা আরো বেশি তত্পর। তারা এক এলাকার বাসিন্দা হয়ে অন্য এলাকায় ছিনতাই করে; সেই এলাকার অপরাধীরা তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করে থাকে। এমনকি স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীরা আইনি বিপত্তি থেকে রক্ষা পায়। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কবল থেকে বের হয়ে আসতে পারলে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। আর এভাবে ছিনতাইকারীর তত্পরতাও বন্ধ হবে।
ঢাকা শহরসহ অন্যান্য মহানগরে বেআইনি মোটর সাইকেল ও গাড়ির অবাধ বিচরণ রয়েছে। এক ঢাকাতেই চলে ২০ হাজারের বেশি মোটর সাইকেল যার অধিকাংশই আবার লাইসেন্স ছাড়া। সাংবাদিক ও ওষুধ কোম্পানির মোটর সাইকেল বাদে এই যানটির অবৈধ ব্যবহার করে থাকে রাজনৈতিক কর্মী এবং অপরাধী-সন্ত্রাসীরা। ছিনতাই বন্ধ করার জন্য নিয়মিত গাড়ি চেক করা দরকার। ঢাকা শহরের অনেক জায়গায় গাড়ি পার্ক করে ওত্ পেতে থাকে ছিনতাইকারী। তাদের চ্যালেঞ্জ জানানোর দায়িত্ব পুলিশ-র্যাবের। অনেক মোড়ে আলো-অন্ধকারে মোটর সাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করে অপরাধীরা, যাদের বাহনটি আবার চোরাই। অর্থাত্ চোরাই গাড়ি ব্যবহার করেই অপরাধীরা মানুষকে বিপদে ফেলার জন্য প্রস্তুত থাকে। তাদের প্রতিরোধের একমাত্র উপায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যাপক অভিযান। ঢাকা শহরে সিএনজি অটোরিকশা যোগে ছিনতাই একটি সাধারণ ঘটনা। কিন্তু যোগাযোগ মন্ত্রণালয় কিংবা বিআরটিএ কি লক্ষ্য করেছে অধিকাংশ সিএনজি অটোরিকশার খাঁচার দরোজার ছিটকিনি ড্রাইভারের নিয়ন্ত্রণে থাকে; তারা মিটারে যাতায়াত করে না। এসব অনিয়ম নিয়মে পরিণত হয়েছে বলেই ঢাকার পরিবহন এখন অপরাধীদের অপরাধ সংঘটনের প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে। কার এবং মাইক্রোবাসও টানা পার্টির কাজে ব্যবহূত হচ্ছে।
ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ দমনে মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা ঠিক মতো অপরাধ সংঘটনের তথ্য পেলে যেমন পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হবেন তেমনি তাদের সফলতাগুলো দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরাও মিডিয়ার দায়িত্ব। অনেক সময় অপরাধীর তথ্যগুলো ঠিক মতো ঠিক জায়গায় পৌঁছায় না, ফলে কার্যকর ফল পাওয়া যায় না। কিংবা একজন র্যাব অথবা পুলিশ সদস্য জনগণের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করেও মন্দ কথা শুনতে পান। এসব ক্ষেত্রে মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পরে গত বছর পর্যন্ত (২০১৩) র্যাব সদস্যরা প্রায় ৩ হাজার ছিনতাইকারী, মলম ও অজ্ঞান পার্টির অপরাধীদের গ্রেফতার করেছেন। অন্যদিকে পুলিশ সদস্যরা কেবল গেল বছর প্রতিটি থানায় বিপুল সংখ্যক অপরাধীদের চিহ্নিত করে ধরতে সক্ষম হয়েছেন বলে তাদের ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এ ধরনের সাফল্যের প্রচার যেমন মিডিয়ায় হয়নি তেমনি আমার ল্যাপটপ ছিনতাই হওয়ার ঘটনাও প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়ায় আসেনি। আমাদের মনে হয় প্রতিটি থানা কিংবা র্যাব ক্যাম্পে কি কি অভিযোগ জমা পড়ছে অথবা কারা কারা কি অপরাধের মামলা দায়ের করছে সেগুলোর তথ্য সংগ্রহ করা এবং প্রচার করা দরকার। একইসঙ্গে আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার অবদান প্রচার করা হলে তাদের ওপর জনগণের আস্থা বাড়বে; সাধারণ মানুষ আর হয়রানির শিকার হবে না। তবে আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার অসাধু কিছু সদস্যের সঙ্গে ছিনতাইকারীদের সম্পর্ক আছে কিনা তাও যাচাই করে দেখা দরকার। কারণ আমরা সব সময়ের জন্য অপরাধীমুক্ত একটি সুন্দর সমাজ প্রত্যাশা করি।