মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগে না পরে কার্যকর করা হবে তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সরকার ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের পরস্পরবিরোধী দাবিকে কেন্দ্র করে এ বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। তবে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক জানিয়েছেন, কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি নিতে জেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায় নয়, আপিল বিভাগের সংক্ষিপ্ত আদেশের সার্টিফায়েড কপি পেলেই রায় কার্যকর করা যাবে বলে তিনি অভিমত দেন। একই মত দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম। এর আগে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করেছিলো কারা কর্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গে কামারুজ্জামানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর রিভিউ পিটিশন দাখিল করা হবে। রিভিউ পিটিশন দাখিল ও নিষ্পত্তির পূর্বে ফাঁসি কার্যকর করা হলে তা হবে বেআইনি। এ নিয়ে গতকাল বুধবার দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে কীভাবে ফাঁসি কার্যকর করা হবে তা নিয়ে সরকার ও কারা কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সূত্র জানায়।
একাত্তরে শেরপুর জেলার নলিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে নির্বিচারে হত্যার দায়ে গত রবিবার আপিল বিভাগ এম. কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে এ রায় দেয়। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি এখনো প্রকাশ পায়নি। তবে ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাহী আদেশ পেলেই কারা কর্তৃপক্ষ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করবে বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার কামারুজ্জামানকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। গতকাল বুধবার সকালে কামারুজ্জামানের সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যরা কারাগারে সাক্ষাত্ করেন। সাক্ষাত্ শেষে কারাগার থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কামারুজ্জামানের ছেলে হাসান ইমাম বলেন, বাবাকে কাশিমপুর থেকে ঢাকায় আনায় আমরা চিন্তিত। আজকের দেখা শেষ দেখা তা ভাবছি না, এটা নিয়মিত সাক্ষাতের অংশ।
অপরদিকে দুপুরে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের সঙ্গে তার সচিবালয় কার্যালয়ে সাক্ষাত্ করেছেন আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন। গতকাল দুপুর ১২টায় তিনি সাক্ষাত্ করেন। সূত্র জানায়, কীভাবে কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন আইনমন্ত্রী।
প্রসঙ্গত, প্রচলিত আইনে ফৌজদারি কার্যবিধি ও জেল কোডের বিধান অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকর করা হয়। জেল কোডের বিধান অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কপি পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার জন্য আসামিকে সাত দিনের সময় দেয়া হয়। এই সাতদিন সময় অতিবাহিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি যদি ফাঁসি কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ বা দণ্ড মওকুফ বা হ্রাস না করেন তাহলে কারাকর্তৃপক্ষকে ২১ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করতে হয়। কিন্তু প্রচলিত ফৌজদারি আইন ও জেল কোডের বিধান যুদ্ধাপরাধের দণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কেননা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস (আইন) ১৯৭৩ একটি বিশেষ আইন। প্রয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণ আইনের চেয়ে বিশেষ আইন প্রাধান্য পাবে। ওই আইনের ২০(৩) ধারায় বলা আছে, ‘এই আইনের অধীন প্রদত্ত দণ্ড কার্যকর হইবে সরকারের আদেশাবলী অনুযায়ী।’ অর্থাত্ রাষ্ট্রপতি প্রাণভিক্ষার আবেদন যেদিনই নাকচ করবেন সেদিন থেকে যে কোন দিন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে। কিন্তু কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। আসামিপক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিভিউ পিটিশন দাখিলের সুযোগ কামারুজ্জামানের রয়েছে। একই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিলো কাদের মোল্লার ফাঁসির পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর। সেসময় রিভিউ পিটিশন দাখিলের অনুমতি চেয়েছিলেন কাদের মোল্লা। একইসঙ্গে কারা কর্তৃপক্ষের ওপর ফাঁসি কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ চেয়েছিলেন। এ নিয়ে দু’দিন শুনানির পর কাদের মোল্লার আবেদন নাকচ করে দেয় আপিল বিভাগ। কিন্তু সেই রিভিউ পিটিশনের রায় প্রায় এক বছরেও প্রকাশ পায়নি। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ওই রায় যদি এতদিনে প্রকাশ পেত তাহলে রিভিউ পিটিশন দাখিল করা নিয়ে আজকে যে বিভ্রান্তি তার অবসান হতো।
আপিল বিভাগ সোমবার কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডাদেশের প্রশ্নে বিভক্ত রায় দেয়। চারজন বিচারকের মধ্যে তিনজনই মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নে একমত হয়েছেন। বিভক্ত রায় হওয়ার কারণে তিন বিচারপতির রায়ের পর ভিন্নমত প্রদানকারী বিচারপতি তার রায় লিখবেন। তারপর দুইটি রায় একত্রে প্রকাশিত হবে। এ রায় প্রকাশের আগে না পরে কিংবা আপিল বিভাগের সংক্ষিপ্ত আদেশের ভিত্তিতে ফাঁসি কার্যকর করা হবে কি-না তা নিয়ে উভয়পক্ষের আইনজীবীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কামারুজ্জামানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন দায়ের করা হবে- এই মর্মে রায়ের সার্টিফায়েড কপি চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন দাখিল করা হয়েছে। আমরা মনে করি- সোহাগপুর গ্রামে হত্যার জন্য আপিল বিভাগ তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের এই রায়টি বিভক্ত রায়। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন দায়ের করব। আশা করি- রিভিউতে সুবিচার পাব। তিনি বলেন, রিভিউ পিটিশন শুনানির পর আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই হবে ন্যায়বিচার, এটাই দেশবাসী আশা করে।
অপরদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের রায়েই বিস্তারিত বলা আছে। আপিল বিভাগ সেই রায় বহাল রেখেছে। এখন ফাঁসি কার্যকরের ক্ষেত্রে জেল কর্তৃপক্ষের কি আপিল বিভাগের পুরো রায়ের প্রয়োজন আছে? পুরো রায় না পেলে কিছুই করা যাবে না এ বিষয়ে আমি একমত নই। কীভাবে কামারুজ্জামানের দণ্ড কার্যকর হবে সেটা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা ভিক্ষার জন্য পূর্ণাঙ্গ রায়ের দরকার আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এ ক্ষেত্রে পুরো রায়ের প্রয়োজন হবে না। কারণ আসামিকে দোষ স্বীকার করে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে হয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র কামারুজ্জামানকে প্রাণভিক্ষার সুযোগ দেবে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
আইনমন্ত্রীর প্রেস ব্রিফিং
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটা রায় আছে, সেখানে রিভিউ পিটিশন (কাদের মোল্লার) খারিজ হয়েছে, সেটা ধরে নিয়ে জেল কতৃ?র্পক্ষকে কামারুজ্জামানের রায় কার্যকরের প্রস্তুতি নিতে আদেশ দেয়া হয়েছে। গতকাল বিকালে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
কামারুজ্জামানকে আপিল বিভাগের রায় জানানো হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আমি যতটুকু জানি তাকে (কামারুজ্জামান) জানানো হয়েছে যে, তার আপিল খারিজ হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা ভিক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনানুগভাবে যে মুহূর্ত থেকে কামারুজ্জামান জানবেন আপিল বিভাগ তাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে সেই মুহূর্ত থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষার সময় গণনা শুরু হবে। আর এক্ষেত্রে তিনি সাতদিন সময় পাবেন। মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার আপত্তির বিষয়ে অবস্থান জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা, কানাডা সবাইকেই আমরা বলেছি, মানবতাবিরোধী অপরাধের শাস্তির ব্যাপারে বিধান আছে—সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসি, এ ব্যাপারে আমরা কারও সঙ্গে কোন আপস করতে রাজি নই।
কামারুজ্জামানের সাক্ষাত্ চেয়ে
পাঁচ আইনজীবীর চিঠি
কামারুজ্জামানের সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার সাক্ষাত্ চেয়ে তার পাঁচ আইনজীবী কারা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে আপিল বিভাগের রায়-পরবর্তী আইনি নির্দেশনা বিষয়ে কামারুজ্জামানের মতামত জানতে গতকাল সিনিয়র জেল সুপার বরাবর এ চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, আপিলের রায়ের বিষয়ে কামারুজ্জামানের দিক-নির্দেশনার জন্য তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে চাই। অতএব মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শের জন্য কামারুজ্জামানের সঙ্গে আলাদা কক্ষে সাক্ষাতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। অ্যাডভোকেট মোহাম্মাদ শিশির মনির এ চিঠি দেন। অপর চার আইনজীবী হলেন, মতিউর রহমান আকন্দ, এহসান এ সিদ্দিক, নাজিব মোমেন ও মশিউল আলম। জেল কর্তৃপক্ষ আজ সকাল ১০টায় সাক্ষাতের অনুমতি দিয়েছে তার আইনজীবীদের।