নৌ-পরিবহন ধর্মঘট শুরু

নৌপথে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং নোয়াখালীর মাঝেরচর চৌধুরীরহাট এলাকার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী বন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানাকারী পণ্য বোঝাই জাহাজে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর নিখোঁজ নৌযান কর্মী ও শ্রমিকদের সন্ধানের দাবিতে গতকাল শনিবার সকাল থেকে নৌ-পরিবহন ও নৌযান শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু হয়েছে। দেশের প্রধান প্রধান নদীবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের কোন কোনটিতে দুপুর থেকে বার্জ ও জাহাজের শ্রমিকরা ধর্মঘট শুরু করেছেন। ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। বার্জ ও জাহাজসহ নৌযান মালিকরা এই ধর্মঘটে নৈতিকভাবে সমর্থন জানিয়েছেন। এর ফলে সারাদেশে নৌপথে পণ্য পরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম অফিস: আভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী পণ্যবাহী একটি জাহাজে ডাকাতি এবং ৭ জন নিখোঁজ হওয়ার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে কর্মরত লাইটারেজ শ্রমিকরা গতকাল শনিবার দুপুর থেকে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। একইসাথে চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য স্থানে পণ্যবাহী বার্জ ও জাহাজের শ্রমিকরাও কাজ হতে বিরত রয়েছেন। আবার বন্দরের বহির্নোঙ্গরে মাদার ভেস্ল থেকে পণ্য খালাসে নিয়োজিত অনেক লাইটারেজ জাহাজের কাজ চলছিল। অপরদিকে লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নবী আলম ‘ইত্তেফাক’কে জানান, কর্ণফুলী নামে একটি পণ্যবাহী জাহাজে ডাকাতির সংবাদে শ্রমিকদের দাবির প্রেক্ষিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য পণ্যবাহী বার্জ ও জাহাজে ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছে।
‘কর্ণফুলী’ নামে যে জাহাজে ডাকাতির কথা বলা হয়েছে বাস্তবে ওই জাহাজের লোকজনের মধ্যে মারামারি সংঘটিত হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। শুক্রবার সকাল ৭টায় ‘কর্ণফুলী’ জাহাজটি চট্টগ্রামের কাফকো জেটি থেকে ১৪ হাজার ৪শ বস্তা সার নিয়ে বাঘাবাড়ী বন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে। জাহাজের বাবুর্চিকে গত ৩১ অক্টোবর লস্কর টিটু ও শামীম জাহাজ থেকে বের করে দেয়। কিন্তু জাহাজের মাস্টার, সুকানিসহ অন্যরা তা স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। এ নিয়ে টিটু ও শামীমের সাথে তাদের মতবিরোধ চলছিল। শুক্রবার কাফকো জেটি থেকে জাহাজ ছাড়ার সময় টিটু ও শামীম তাদের পছন্দের একজন বাবুর্চিকে জাহাজে তুলে নেয়। এরপর তাদের দ্বন্দ্ব আরো বাড়তে থাকে। শনিবার রাত ১০টা নাগাদ জাহাজটি রামগতি উপজেলার মেঘনারচর আবদুল্লাহ নামক স্থানে পৌঁছার পর উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় কে বা কারা জাহাজের ইঞ্জিন রুমের একটি ছাড়া সকল বাতি বন্ধ করে দেয়। সংঘর্ষের ভয়াবহতা দেখে জাহাজের গ্রিজার পারভেজ একটি বয়া নিয়ে জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়ে ও একটি বালুচরে গিয়ে ওঠে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে কেবিনে বিশ্রামে থাকা লস্কর জাহিদ ও মাহবুবকে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। জাহাজের অপর লস্কর টিটু তাদের মোবাইলও নিয়ে যায়।
জাহাজটি সারারাত মেঘনা নদীতে ভাসতে থাকে এবং সকালে কমলনগর থানাধীন বাতির খাল নামক স্থানে অপেক্ষমাণ অপর একটি জাহাজকে ধাক্কা দেয়। সে সময় ওই জাহাজের লোকজন পণ্যবোঝাই ‘কর্ণফুলী’ জাহাজ লোকজনশূন্য দেখতে পায়। পুলিশ এসে কেবিন থেকে মাহবুব ও জাহিদ নামে দু’জনকে উদ্ধার করে। কমলনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, পারভেজ, মাহবুব ও জাহিদকে তাদের হেফাজতে নিয়েছেন। তিনি জানান, জাহাজে ব্যাপক রক্তপাত লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া টিটু ও শামীমের ব্যাগ ও মালামাল ছাড়া অন্যদের ব্যাগ ও মালামাল পাওয়া গেছে। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের কারণে এ ঘটনা ঘটতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে টিটু, শামীম, মাস্টার সুকানি, বাবুর্চি এবং অন্য এক অতিথি নিখোঁজ রয়েছে।
আশুগঞ্জ সংবাদদাতা: কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসাবে গতকাল সকাল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ নৌবন্দরে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু হয়েছে। ধর্মঘটের কারণে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আশুগঞ্জ নৌবন্দরে আটকা পড়েছে ২ শতাধিক মালবাহী বার্জ ও জাহাজ। রাতের মধ্যে বন্দরে বার্জ ও জাহাজের সংখ্যা বেড়ে দিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব বার্জ ও জাহাজ থেকে মালামাল উঠানামা বন্ধ করে দিয়েছে নৌযান শ্রমিকরা। এ ব্যাপারে শনিবার বিকালে আশুগঞ্জ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রতিবাদ সমাবেশ।
আশুগঞ্জ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন অফিস সুত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মালামাল নিয়ে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীর উদ্দেশে ‘এমভি কর্ণফুলী’ জাহাজ রওয়ানা হয়। জাহাজটি নোয়াখালীর মাঝেরচর চৌধুরীর হাট সীমানায় শুক্রবার ভোরে পৌঁছলে জাহাজটি ডাকাতের কবলে পড়ে। ডাকাতরা জাহাজের শ্রমিকদের ব্যাপক মারধর করে এবং জিনিসপত্র লুটে নিয়ে যায়। ৭ জন শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে নৌযান শ্রমিকরা গতকাল শনিবার সকাল থেকে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেয়। ধর্মঘটের ফলে ইতিমধ্যে আশুগঞ্জ বন্দরে ২ শতাধিক নৌযান আটকা পড়েছে। রাতের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থানকারী বার্জ ও জাহাজ আশুগঞ্জ নৌবন্দরে চলে আসলে আটকে পড়া নৌযানের সংখ্যা ৪ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন নৌযান শ্রমিকেরা। নৌযান শ্রমিকদের নদীপথে ডাকাতের কবলে পড়ে শারীরিক আঘাতসহ দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ায় তাদের আন্দোলনের সাথে মালিকরাও নৈতিকভাবে সমর্থন জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক ও আশুগঞ্জ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সমন্বয়ক মোঃ বাহার মাষ্টার জানান, বিভিন্নস্থানে অবস্থানকারী নৌযানগুলো আশুগঞ্জ নৌবন্দরে আসছে। নৌপথে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ, নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধান ও দোষীদের গ্রেফতার না করা পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে। বাংলাদেশ কার্গো বোয়েলস ওনার্স এসোনিয়েশন কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হাজী মোঃ নাজমুল হোসাইন হামদু জানান, নৌপথে ডাকাতি-চাঁদাবাজিতে মালিক-শ্রমিক অতিষ্ঠ। প্রায়ই নারায়ণগঞ্জের বৈদেরবাজার এলাকায় শ্রমিকরা চাঁদাবাজির শিকার হন। নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধানে নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘট যৌক্তিক। তাই তাদের আন্দোলনে মালিকদের নৈতিক সমর্থন রয়েছে।
মংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা: শনিবার দুপুর থেকে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের নৌ পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। এর ফলে মংলা বন্দরসহ সারাদেশে নৌপথে পণ্য পরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক আবুল কাসেম মাস্টার জানান, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সিমেন্ট বোঝাই কার্গো জাহাজ এম,ভি কর্ণফুলি-৫ শনিবার ভোরে লক্ষ্মীপুরে রামগতির বাতিরখাল এলাকায় পৌঁছালে একদল সশস্ত্র ডাকাত ওই জাহাজে হামলা চালায়। এ সময় ডাকাতরা কার্গোর স্টাফদের মারধর করে বিভিন্ন মালামাল লুটে নেয়। এ ঘটনায় ওই জাহাজের ৭ নাবিক নিখোঁজ হয়। নিখোঁজ নাবিকদের জীবিত উদ্ধারসহ নৌপথে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী ও ডাকাতি বন্ধের দাবিতে শনিবার দুপুর থেকে অনির্দিষ্টকালের নৌ পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়।
নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের মংলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন চৌধুরি জানান, নৌ শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য এর আগেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নৌ মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছিলো। কিন্তু কেউই কর্ণপাত করেননি। সকালে কেন্দ্রের নির্দেশে দুপুর থেকে এই ধর্মঘট শুরু হয়। নৌ ধর্মঘটের কারণে মংলা বন্দরে অবস্থানরত জাহাজ থেকে পণ্য বোঝাই-খালাস কাজ হলেও বন্ধ রয়েছে পণ্য পরিবহনের কাজ। বর্তমানে মংলায় অবস্থানকারী শতাধিক নৌযানের পরিবহন কাজ বন্ধ রয়েছে।