প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কৃষিতে ভর্তুকির ব্যাপারে আপত্তি জানালেও সেসব বিদেশি দাতা সংস্থার চাপ অগ্রাহ্য করে সরকার কৃষিতে ভর্তুকি অব্যাহত রেখেছে। কৃষককে ভর্তুকি দিয়ে বীজ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হচ্ছে এবং বছরে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা কৃষি ঋণ দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক উন্নত দেশ কৃষকদের সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে; অথচ আমাদের বেলায় অনেক রকম শর্ত চলে আসে। যদিও আমরা তা গ্রহণ করি না। বাংলাদেশের একটা মানুষও যেন ক্ষুধায় কষ্ট না পায় সে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও শষ্যের বহুমুখিকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
গতকাল রবিবার সচিবালয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শন ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা কৃষিতে ভর্তুকির বিরোধিতা করে। ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচনের আগে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের যে প্রতিনিধি বাংলাদেশে আসেন তিনি আমার কাছে বিশাল এক তালিকা নিয়ে আসে। এর মধ্যে, কৃষিতে ভর্তুকি বন্ধের কথা ছিল। আমি তখন তাকে বলি, ঠিক আছে। আমরা আমাদের নিজেদের টাকায় কৃষকদের ভর্তুকি দেব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাদ্যটা যদি সঠিক সময়ে দিতে না পারি, তাহলে কাদের জন্য কাজ করছি? বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করতেই হবে। কৃষি উত্পাদন বাড়াতে প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, কৃষকদের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
খাদ্য উত্পাদন বাড়াতে গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা গবেষণার ওপর জোর দিয়েছি বলেই দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনি বলেন, ধান চাষকে দক্ষিণাঞ্চলে আর শষ্য জাতীয় ফসল চাষকে উত্তরাঞ্চলে নিয়ে যেতে গবেষণা চলছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারিভাবে খাদ্য সংগ্রহ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সারের উত্পাদন বাড়িয়েছি। এর বিতরণ ব্যবস্থাকে একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে এসেছি। বিএনপি আমলের মতো এখন আর কৃষকদের সারের জন্য গুলি খেয়ে মরতে হয় না। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ার প্রসঙ্গটি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগের চেয়ে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। আগে একদিনের আয় দিয়ে একজন শ্রমিক যেখানে ২/৩ কেজি চাল কিনতে পারতো। এখন সেখানে তারা ১০/১২ কেজি চাল কিনতে পারে। তবে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। সরকার পরিচালনায় নিজের দর্শন তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, রাজনৈতিক দল হিসাবে সবারই চিন্তার পার্থক্য থাকে। আওয়ামী লীগ কারো কাছে ‘হাত পেতে’ চলতে চায় না। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ গবেষণায় থোক বরাদ্দ দিয়েছিল। এর ফল বাংলাদেশ এখন পাচ্ছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশের চাল আমদানি করতে হয়নি, বরং ৫০ হাজার টন চাল শ্রীলঙ্কায় রপ্তানি করেছে। আর ২০১৪ সালে দেশে তিন কোটি ৬৮ লাখ টন খাদ্যশষ্য উত্পাদন হবে। অতীতে বিএনপির জামায়াত জোটের বিদেশমুখী নীতির পরিবর্তে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের নীতিতে বিশ্বাস করে আওয়ামী লীগ সরকার।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একসময় আমরা যখন বলেছিলাম দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে চাই। তখন বিএনপির তরফ থেকে তাদের নেত্রী কিংবা তাদের অর্থমন্ত্রী সংসদে এ কথাও বলেছিল, খাদ্য উত্পাদন বাড়ানো বা দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা ভাল নয়। কারণ, তাহলে বিদেশ থেকে সাহায্য পাওয়া যাবে না। তবে আমরা সরকার গঠন করে সবসময় চিন্তা করেছি আমাদেরকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে এবং একটা আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে আমাদেরকে গড়ে তুলতে হবে। আমরা কারও কাছে ভিক্ষা চেয়ে চলতে চাই না।
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের বেঁধে দেয়া সময়ের আগেই দারিদ্র্য অর্ধেকে নামিয়ে আনায় বাংলাদেশকে দেয়া খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ডিপ্লোমা অ্যাওয়ার্ড প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। এছাড়া খাদ্যমন্ত্রী অনুষ্ঠানের শুরুতেই তার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অগ্রগতি সরকার প্রধানের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গতকাল পর্যন্ত দেশে ১১ লাখ ৩২ হাজার ২০২ টন চাল এবং দুই লাখ ২৬ হাজার ৭১৩ টন গমের মজুদ রয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় তিন লাখ টন বেশি। অনুষ্ঠানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মুশফিকা ইকফাত্সহ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।