বিনা টিকেটে মেট্রোরেলে চড়লে ভাড়ার ১০ গুণ জরিমানা, অনাদায়ে ৬ মাসের কারাদণ্ড, অনুমতি ছাড়া লাইসেন্স হস্তান্তর করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা, মেট্রোরেল ও যাত্রীর বীমা বাধ্যতামূলক এবং ভূমি অধিগ্রহণের জন্য বিশেষ বিধান রেখে ‘মেট্রোরেল আইন-২০১৪’র খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভায়। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। এছাড়া মন্ত্রিসভায় ‘সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আইন-২০১৪’ ও ‘ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন-২০১৪’র খসড়ার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তবে ‘অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ (সংশোধন) ২০১৪’র খসড়া ফেরত পাঠিয়েছে মন্ত্রিসভা। ভূমি ও আইন মন্ত্রণালয়কে আইনের এ খসড়াটি পর্যালোচনা করে ফের মন্ত্রিসভায় উত্থাপনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা সাংবাদিকদের প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এরমধ্যে জাইকা ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা দিচ্ছে। বাকি ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা সরকার দেবে। মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য হবে ২০ দশমিক এক কিলোমিটার। তিনি বলেন, সরকারের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প মেট্রোরেল (এমআরটি-৬) পরিচালিত হবে সরকারি ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে। এর নিয়ন্ত্রণ ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) হাতে থাকবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের আরো প্রকল্প হাতে নেয়া হলে তা এ আইনের আওতায় আসবে। তিনি বলেন, মেট্রোরেল পরিচালনার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সবাইকে লাইসেন্স নিতে হবে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্স ফি দিতে হবে না। ডিটিসিএ’র নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বে একটি কমিটি এ লাইসেন্স দেবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মেট্রোরেল পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করলে দুই বছর জেল ও ২ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া মেট্রোরেল নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে এক বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা, সংরক্ষিত স্থানে কেউ বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করলে এক বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা, মেট্রোরেলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করলে ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মেট্রোরেলের টিকেট জাল করলে ১০ বছর কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান খসড়া আইনে রয়েছে।
মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের সবশেষ অবস্থা প্রসঙ্গে সচিব বলেন, ডিজাইন চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে প্রস্তুতিমূলক জরিপ কাজ চলছে। আগামী ২০১৯ সালের মধ্যে মেট্রোরেল চালুর পরিকল্পনার কথা ইতিমধ্যে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের আওতায় উত্তরা থেকে শুরু করে মিরপুর-ফার্মগেট হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত যাবে এই মেট্রো রেল। সময় লাগবে ৪০ মিনিটেরও কম। এ প্রকল্পে ১৬টি স্টেশন থাকবে। এগুলো হলো উত্তরা (উত্তর), উত্তরা (সেন্টার), উত্তরা (দক্ষিণ), পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০ নম্বর, কাজীপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও, বিজয় সরণি. ফার্মগেট, সোনারগাঁও, জাতীয় জাদুঘর, দোয়েল চত্বর, জাতীয় স্টেডিয়াম ও বাংলাদেশ ব্যাংক মোড়ে। সরকার বলছে, প্রতি চার মিনিট পরপর ১ হাজার ৮শ’ যাত্রী নিয়ে ছুটে চলবে মেট্রোরেল।
‘ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন-২০১৪’র খসড়া প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ও আন্তর্জাতিক মানে তা উন্নীত করতে এ উগ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পুঁজিবাজরে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
‘সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) আইন-২০১৪’র খসড়া প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এটি পিপিপি’র বিদ্যমান নীতি ও কৌশলকে কার্যকর বৈধতা দেবে। প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ক্ষেত্র বিশেষে অর্থনৈতিক বিষয়ক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পিপিপি’র প্রকল্পগুলো অনুমোদন করবে। এতে পারস্পরিক সম্মতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি, তৃতীয় পক্ষের কোন মধ্যস্থতাকারী সহায়তা ও সালিশির বিধান রাখ হয়েছে। এ আইনের খসড়ায় ৭টি অধ্যায় ও ৪৪টি ধারা রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, পিপিপি কার্যক্রমের দিক-নির্দেশনার জন্য উপদেষ্টা পরিষদ থাকবে এবং এটির প্রধান হবেন প্রধানমন্ত্রী। ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে থাকবেন অর্থমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এর মেম্বার সেক্রেটারি হবেন। তারা পলিসি গাইডলাইন দেবেন ও পিপিপি কার্যক্রম মনিটরিং করবেন। কোন সমস্যা সৃষ্টি হলে তা নিরসন করবে এই পরিষদ। পিপিপির আওতায় কোন প্রকল্প করতে হলে একটি কোম্পানি করতে হবে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ৩৯টি প্রকল্প পিপিপির আওতায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ চলছে।
মন্ত্রিসভায় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুত্ বাণিজ্য সমপ্রসারণে ‘সার্ক ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট ফর এনার্জি কো-অপারেশন (ইলেকট্রিসিটি)’র খসড়া অনুমোদন পেয়েছে। আগামী ২৬ ও ২৭ নভেম্বর নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া মন্ত্রিসভা সার্ক দেশগুলোর জন্য সার্ক রিজিওনাল রেলওয়ে এগ্রিমেন্টও অনুমোদন করেছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ১৪তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে এ চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর আওতায় বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান, বাংলাদেশ-নেপাল-ভারত এবং বাংলাদেশ-ভুটান-ভারতের মধ্যে বেশ কয়েকটি রেল সংযোগ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ চুক্তিও আসন্ন সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে স্বাক্ষরিত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সম্মেলনে যোগ দেবেন।
এছাড়া বৈঠকে গত ১৩-১৬ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব সম্মেলনে শিল্পমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের অংশগ্রহণ, গত ৯-১০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ‘শান্তির সংস্কৃতি’ বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের অংশগ্রহণ, গত ২২-২৬ সেপ্টেম্বর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার ৫৮তম জেনারেল কনফারেন্সে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের অংশগ্রহণ সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করা হয়। মন্ত্রিসভার বৈঠকের শুরুতে শহীদ নূর হোসেনের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং তার আত্মত্যাগের বিষয়টি স্মরণ করা হয়।