নামেই ফরমালিনমুক্ত!

রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজার। দুই বছর আগে বাজারটিকে ‘ফরমালিনমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) সরবরাহ করে ফরমালিন শনাক্তকরণ যন্ত্র। তবে ‘ফরমালিনমুক্ত’ এই বাজারে এখন আর নিয়মিত ফরমালিন পরীক্ষা করা হয় না। যন্ত্রটি তালাবদ্ধ থাকে বাজার ব্যবসায়ী সমিতির কার্যালয়ে।

অন্যদিকে এফবিসিসিআই যে যন্ত্র সরবরাহ করেছে সেটির কিটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও বাজার সমিতি কিট পাল্টায়নি। ফলে মেয়াদহীন যন্ত্র এখন আর কাজে আসছে না। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন ফরমালিন মুক্তকরণ উদ্যোগের সঙ্গে শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন। তিনি বলেন, বর্তমানে রাজধানীর ১১টি বাজার এবং রাজধানীর বাইরে ১২টি জেলার বাজারে এফবিসিসিআইয়ের উদ্যোগে ফরমালিন শনাক্তকরণ যন্ত্র রয়েছে। তবে বাজারগুলোতে কেবল মাছ পরীক্ষা করার জন্য এই যন্ত্র দেয়া হয়েছিল। রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজার ও মহাখালী কাঁচাবাজারে এই যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে না। অন্যান্য বাজারে এই যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
বাজারগুলোতে এই যন্ত্র শতভাগ ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফরমালিন মেশানো বন্ধ করতে হলে যথাযথ আইন ও এর প্রয়োগ থাকতে হবে।
সমপ্রতি এই প্রতিবেদক মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। গত সোমবার এই বাজারে গিয়ে দেখা যায়, একজন ক্রেতা মাছ কিনে ফরমালিন পরীক্ষা করতে চাইলেন। তবে ফরমালিন শনাক্তকরণ যন্ত্রটি বাজারের কোথাও পাওয়া যায়নি। পরে জানা গেল, সেটি বাজার সমিতির কক্ষে তালাবদ্ধ। বাজার করতে আসা মো: হানিফ নামের একজন ক্রেতা বলেন, বিশ্বাস করে কিনতে হচ্ছে। কতটা ফরমালিনমুক্ত তা নিশ্চিত নই। ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। নিয়মিত ফরমালিন পরীক্ষা করা হয় বলে জানি কিন্তু এখানে এসে সে বিশ্বাস বদলে গেলো।
গতকাল মঙ্গলবার সারাদিন বাজারে অবস্থান করেও ফরমালিন পরীক্ষার কোনো আয়োজন চোখে পড়েনি। তবে বাজারে নিয়মিত ফরমালিন পরীক্ষা করা হয় বলে দাবি করেন মাছ ব্যবসায়ী সুক্কুর আলী। তিনি বলেন, সকালে পরীক্ষা করা ছাড়া কোনো পণ্য বাজারে ঢুকতে দেয়া হয় না। ফরমালিন পাওয়া গেলে তা পাইকারি বাজারে ফেরত পাঠানো হয়। তবে আরেক মাছ বিক্রেতা আনোয়ার জানান, মাস তিনেক আগে একদিন ফরমালিনের পরীক্ষা হয়েছিল।
বাজার বণিক সমিতির আহবায়ক মজিবর রহমান এবং সদস্য সচিব শাহজাহান খান বলেন, যন্ত্রটি সমিতির কার্যালয়ে আছে। লোকবল সংকটের কারণে নিয়মিত পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। তবে বেশিরভাগ সময় এটি ব্যবহার  হয় বলে জানান তারা।
অন্যদিকে চলতি বছরের ২৫ মে মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় ফরমালিনযুক্ত প্রায় চার মণ মাছ জব্দ করে পরে তা নষ্ট করা হয়। তখন দেখা যায়, একটি বোয়াল মাছে দশমিক ৫৩ মাত্রায় ফরমালিন মেশানো ছিল। আর রুই ও কাতলা মাছে ছিল দশমিক ৩৫ মাত্রায় ফরমালিন। ছোট ছোট মাছের ওপরও ফরমালিন ছড়িয়ে দেয় বিক্রেতারা। ট্যাংরা, বেলে, কাজরি, মলা মাছে পাওয়া যায় দশমিক ৬০ মাত্রার ফরমালিন।
তবে দশমিক শূন্য এক মাত্রার ওপরে ফরমালিন থাকলে সেটা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ঐ সময় এই বাজারের লিচুতে ৯ দশমিক ২০ মাত্রার ফরমালিনের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিলো। আমে পাওয়া গিয়েছিলো ৭ দশমিক ৯৩ এবং জামরুলে দশমিক ৮২ মাত্রার ফরমালিন।

সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা বাজারে অভিযান চালিয়ে মাছ ও ফলে ফরমালিন শনাক্ত করছে। তবে তারা এমন কোনো বাজারের খোঁজ দিতে পারেনি যেখানে গেলে ক্রেতারা নিশ্চিন্তে পণ্য কিনতে পারবেন। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) আহবায়ক আবু নাসের খান বলেন, বিভিন্ন বাজারে ফরমালিন শনাক্তের যে মেশিন রয়েছে সেগুলো নিয়ে বিতর্কের কোন যৌক্তিকতা নেই। অন্য কোন উপায়ে ফরমালিন পরীক্ষা করলে হয়তো কম বেশি হতে পারে। তাই বলে একটি পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক করা ঠিক না। তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন বাজারে ফরমালিন পরীক্ষার যে যন্ত্র রয়েছে সেটি ব্যবহারের জন্য বাজার কমিটি এবং ক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো দরকার।