কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি ঢাকায়
কমবেশি একশ’ বছর ধরে ঢাকায় চলছে মোটর গাড়ি। দিন যত যাচ্ছে সড়কে বাড়ছে গাড়ির সংখ্যা। কিন্তু এতো বছরেও ঢাকায় একটি কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ঘর থেকে বের হলেই নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী হচ্ছে যানজট। মহাদুর্ভোগে পড়ছে রাজধানীবাসী। আর নগরবাসীও যেন একে নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছে।
রাজধানীতে যানজটের ব্যাপারে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ বলছে, প্রতিদিনই রাস্তায় নামছে নতুন যানবাহন। কিন্তু সে তুলনায় সড়ক নতুন গড়ে ওঠেনি। আবার সড়কের বেশির ভাগ অংশই হকারদের দখলে।
যান চলাচল সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় ঢাকার ৬৪ টি ট্রাফিক পয়েন্টে যে সিগন্যাল বাতি বসানো হয়েছিল তার ৩৪ টিই বিকল। আবার যেসব পয়েন্টে সিগন্যাল বাতি সচল, সেখানেও গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে ট্রাফিক পুলিশ। এ অবস্থায় রাজধানীর যানজট নিরসনে ট্রাফিক বিভাগের ৬৪ টি পয়েন্টে বসানো হয়েছে সময়বাতি। অর্থাত্ সময়বাতি যে নির্দেশনা দেবে সে অনুযায়ী চলবে গাড়ি। নতুন এই ব্যবস্থা কতটুক কার্যকর হবে তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, যেখানে আধুনিক সিগন্যাল বাতিই অকেজো হয়ে পড়ে থাকে সেখানে সময়বাতির কি অবস্থা হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান করতে হয়। কিন্তু ঢাকায় এ ধরনের কিছু দেখা যায় না। বিরাজ করছে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা। এছাড়া এদেশের চালক ও পথচারীদের মধ্যে আইন না মানার প্রবণতা কাজ করে।
মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মিলি বিশ্বাস ইত্তেফাককে বলেন, ট্রাফিক সিগন্যালের পুরো সিস্টেমটি দেখভালের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের। রাজধানীর ৩৪টি পয়েন্টে সিগন্যাল বাতি অকেজো হয়ে আছে। এর সঙ্গে সময়বাতি সংযুক্ত হলে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থা কেমন হবে তা ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগই ভাল বলতে পারে। তিনি বলেন, রাজধানীতে দৈনিক প্রায় ২শ নতুন গাড়ি রাস্তায় নামে। ঐসব গাড়ি বিআরটিএ থেকে চলাচলের অনুমোদন পেয়ে থাকে। যানবাহনের তুলনায় রাস্তা নেই, যা আছে তাও ফুটপাত ও হকারদের দখলে থাকে অর্ধেক। তিনি আরো বলেন, বেশির ভাগ রাস্তায় নেই রোড মার্কিং। এতসব জটিলতার মধ্যে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে যেটুকু সম্ভব তা করছে নিত্যদিন। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও যানজট নিরসন একা ট্রাফিকের পক্ষে সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীসহ আশপাশে মিনিবাস চলে ১০ হাজার, সিএনজি অটোরিকশা আছে ৮ হাজার, টেম্পু দেড় হাজারের মতো, প্রাইভেট কার দুই লক্ষাধিক, মাইক্রোবাস অর্ধলক্ষাধিক। এছাড়া বিভিন্ন সড়কে রিকশা চলাচল করছে। এই রিকশার সংখ্যাও হবে কয়েক লক্ষ।
১৫ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর ৬৪টি পয়েন্টে সময়বাতি বসানো হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন (দক্ষিণ) তথ্যানুযায়ি পুরা রাজধানীর ৭০টি পয়েন্টে সময়বাতি চালু হচ্ছে। ২০১৩ সাল থেকে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। সিগন্যাল বাতির ন্যায় সময়বাতি তদারকি করবে সিটি কর্পোরেশন। পুলিশ বাতির সংকেত মেনে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবেন।
সিটি কর্পোরেশন (দক্ষিণ) সময়বাতি প্রকল্প পরিচালক নির্বাহী প্রকৌশলী শিহাব উল্লাহ বলেন, সময়বাতির সঙ্গে অন্যান্য কার্যক্রম রয়েছে। সময়বাতি যানজট নিরসনে যথেষ্ট কাজ করবে বলে তিনি জানান।
অভিযোগ উঠেছে, সিগন্যাল বাতি নামে কোটি কোটি লুটপাট হয়েছে। তদারকিতে নেমে বেহাল দশার চিত্র ট্রাফিক কর্মকর্তারা স্বচক্ষে দেখছেন। এরমধ্যে সময়বাতির পরিণতি কি হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন এক শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি জানান রোড মার্কিং করার কিছুদিন পর আর দেখা যায়না। শুধু রাজধানীতে নয় হাইওয়েতেও একই অবস্থা। সিটি কর্পোরেশন (দক্ষিণ) নির্বাহী প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) আনিসুর রহমান বলেন, মেকানিক্যাল বিভাগ থেকে এক বছর কিংবা দুই বছর পরপর রোড মার্কিং করা হয়। কিন্তু এরপর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। এ কাজের জন্য কোন অর্থ বরাদ্দ নেই। এ কারণে সম্ভব হয়না বলে তিনি জানান।
ট্রাফিক ব্যবস্থা কার্যকর করা যাদের দায়িত্ব সেই ট্রাফিক পুলিশের একটি অংশ আইন ভাঙছে। এদের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন না মানার প্রবণতা বেড়ে যায় বলে পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান। সড়কে সিগন্যাল বাতি বসানো হলেও ট্রাফিক পুলিশ হাত দিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। যারা নীতি নির্ধারক ও নিয়মনীতি বাস্তবায়নের ধারক তারাই ট্রাফিক আইন ভাঙছে। খেসারত দিচ্ছে সাধারণ জনগণ।
এ প্রসঙ্গে ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, গত রবিবার সন্ধ্যায় দেখলাম সাবেক শেরাটন হোটেল মোড়ের সিগন্যাল উপেক্ষা করে রং সাইড দিয়ে মোটরসাইকেলে এক পুলিশ কর্মকর্তা যাচ্ছেন। তাকে অনুসরণ করে পিছনে যাচ্ছিল আরেকটি মোটর সাইকেল। আমি গাড়ি থেকে নেমে মোটরসাইকেল আরোহীকে ১২০০ টাকা জরিমানা করি এবং বলি টাকা না দিলে মোটর সাইকেল পাওয়া যাবে না। তখন আশপাশের লোকজন বলা শুরু করলো এদেশে আইন শুধু সাধারণ মানুষের জন্য। আইন অমান্য করে ওই একই পথে মন্ত্রী, সচিবসহ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেশ কয়েকটি গাড়ি চলে গেলো তাদের কিছুই বলা হলো না। ধরা হলো সাধারণ এক মোটর সাইকেল আরোহীকে।
ট্রাফিক বিভাগের ওই কর্মকর্তা বলেন, আইনের প্রয়োগ করতে সবার ওপরই। কাউকে ছাড়লে আর কাউকে শাস্তি দিলে আইন মানবে না কেও।
সংশ্লিষ্টরা জানান, উন্নত দেশগুলোতেও যানজট আছে। কিন্তু সেখানকরা জনগণ আইন মেনে চলে। সেখানে সিগন্যাল বাতির যে নির্দেশনা দেবে সে অনুযায়ি চালক গাড়ি চালায়।
রাজধানীর কয়েক পয়েন্টে কর্মরত ট্রাফিক সদস্যের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, রাজধানীতে বদলি হয়ে আসতে মোটা অংকের উেকাচ লাগে। সঙ্গে লাগে দলীয় তদ্বির। এ উেকাচের টাকা তুলতে তারা অবৈধ বা অবৈধ যানবাহন আটকে উেকাচ গ্রহণ করে । যেখানে অবৈধ গাড়ির জন্য ব্যবস্থা নেবে বা আইন না মানার জন্য জরিমানা করবে সেখানে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা নিচ্ছে ঘুষ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও পুলিশকে কাভার্ড ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন আটকে উেকাচ আদায়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।
পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, পুলিশের মধ্যে কিছু দুষ্ট লোক আছে। তাদের জন্য বিরাট পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হতে পারে না। দুষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। চালক ওপথচারীদের আইন মেনে চলতে হবে। নিয়ম মানলে আইন প্রয়োগের প্রশ্নই আসে না।